রাজর্ষি দাশ ভৌমিক

গোয়েন্দা কানাইচরণ ও পাইস   হোটেলে   হত্যা


অলংকরণঃ লেখক 


সব কি বুঝিয়ে বলতে হবে নাকি

কানাইচরণ জুতোপালিশের লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন- জুতোপালিশের সঙ্গে সঙ্গে যদি মনটাও একেবারে ঝকঝকে পালিশ করে দেওয়া যেত
লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের স্পেশাল সেলের সিনিয়র ইন্সপেক্টর কানাইচরণের চাকরি জীবনের বিগত পঁচিশ বছরের অভ্যাস এই যে বউবাজার স্ট্রীটে নেমে অফিসে ঢুকবার আগে একটিবার জুতোটি পালিশ করিয়ে নেন ডিপার্টমেন্টের আধুনিকীকরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কানাইও লেদার শু পরা ছেড়ে দিয়েছেন কাপড়ের স্নিকার্স পরেন অভ্যাসে তবু বদল হয়নি, শু ক্রিমের বদলে বউবাজার স্ট্রিটের মুচি কাম পালিশওলা টুথব্রাশে জল লাগিয়ে স্নিকার্স পরিস্কার করে দেয় লালবাজারের মার্ডার ও নানাবিধ সমস্যার মধ্যে ডুবে যাওয়ার আগে কানাই এর এইটুকু বিলাস সম্প্রতি নানা ঝামেলায় জড়িয়ে ডিপার্টমেন্টে ক্লোজড হয়েছেন জয়েন্ট সিপি ক্রাইম বলেছেন, লালবাজারের বসে থাকুন, কিন্তু কোন কেস ফাইল আপাতত দেব না কানাইচরণ তাই আসাযাওয়ার মধ্যে আছেন জুনিয়ার ইন্সপেক্টর সৌভিকের খাতায় ডেকার্সে খাচ্ছেন আর যথেচ্ছ সিগারেট পান করছেন মনে মনে এই আশায় আছেন, কোনদিন একটি জমাটি কেস আসে আর জয়েন্ট সিপি বাধ্য হন সাসপেনশান তুলে নিতে
জুতোপালিশের লোকটি কোনদিনই কানাইচরণের দিকে চেয়ে দেখে না তার নজর কানাই এর স্নিকার্সেকানাই ভাবলো -বড় খাঁটি জীবিকা, ডিসি থেকে সিপি থেকে হাবিলদার, এ ব্যাটা সবাইকে চেনে তাদের জুতো দিয়ে কোনোদিন লোকটির নাম জেনে নেবেন, রোজই ভাবেন কিন্তু আজ অবধি আর হয়ে ওঠেনি জুতোপালিশের লোকটি নিজের কাজ করতে করতে কানাইচরণকে বলেস্নিকার্সে কোন লাভ নেই বাবু, যতই পালিশ কর, জুতোর উপর আলো ঝকঝক করে না
কানাই খুচরো গুনে, পাওনা মিটিয়ে লালবাজারে ঢুকে পড়েন রিটায়ারমেন্টের আর বছর কয়েক বাকি মাথার কোঁকরানো চুল সাদা কালোয় অর্ধেক মিশে গেছে, ঝুপো গোঁফ।  মুখের গড়ন দেখে অচেনা লোক ভাবে খবরের কাগজের সাংবাদিকরোগা তিনি কোনদিনই ছিলেন না, কিন্তু তাকে মোটাও বলা যাবে নাউচ্চতা পাঁচ সাত, বেশ গাট্টাগোট্টা চেহারাই বলা চলে চোখে মোটা ফ্রেমের প্লাস পাওয়ারের চশমা লিফট থেকে বেরিয়ে কানাই নিজের চেম্বারে ঢুকলেন সেখানে ইতিমধ্যেই হাজির হয়েছে জুনিয়ার ইন্সপেক্টর সৌভিক কানাইকে চেম্বারের পর্দা ঢেলে ঢুকতে দেখে সৌভিক তাড়াতাড়ি বেয়ারাকে ডেকে বললো-চা আর এক প্যাকেট নেভি কাট কিনে আনতে
কানাই কোন কথা না বলে সৌভিকের টেবিলের উপর রাখা খবরের কাগজ টেনে পড়তে শুরু করে দিলেন সৌভিক নিজের টেবিলে বসে কেস ফাইল পড়ছিল চেম্বারে এসে ঢুকলো জয়েন্ট সিপির আর্দালি
একটা সেলাম ঢুকে বললো-স্যার সাহেব আপনাকে তলব করেছেন
কানাই পেপার থেকে মুখ না তুলেই বললেন- বলো, আসছেন
আর্দালি ফের সেলাম ঠুকে চলে গেল
কানাই এর মেজাজ মুহূর্তে চাঙ্গা হয়ে উঠলো বললেনসৌভিক বুঝলি, সাসপেনশান উঠে গেল
সৌভিক কেস ফাইল সামনে থেকে সরিয়ে বললো- কি করে বুঝলেন? এমনি কোন কনসাল্ট করতে ডাকছেন হয়ত
-ব্যাটা আর্দালি, লাস্ট কয়েক মাস আমাকে দেখে সেলাম অবধি ঢোকেনি ভেবেছে, ফোর্সে বুঝি আমার দিন ঘনিয়ে এল আজ দু-দুটো সেলাম কেমন ঠুকলো লক্ষ্য করিসনি!
সৌভিক হাসলোযাক, আজ ডেকার্সে তাহলে আমি একটা ট্রিট পাচ্ছি
কানাই ধীরেসুস্থে জয়েন্ট কমিশনার অফ পুলিশ (ক্রাইম) এর ঘরের সামনে এলেন চেম্বারের বাইরে দুই অল্পমহিলা বসে আছেকানাই চিনতে পারলেন বাংলা সিরিয়ালের দুই অভিনেত্রী, ছোট রোল, কিন্তু জনপ্রিয়তায় টালিগঞ্জের সিনিয়ার হিরোইনদের লজ্জায় ফেলে দেবেন
কানাই তাদের নমষ্কার করে বললেন- আপনারা কি স্টকিং এর কেসে দেখা করতে এসেছেন?
দুজনের মধ্যে তুলনায় অল্পবয়সী অভিনেত্রীটি অবাক হয়ে বললেন-আপনি কি গোয়েন্দা, আমরা তো এখনও কাউকে বলিনি
কানাই গলাখাকারি দিয়ে বললেন-কাউকে বলেননি মানে পুলিশকে বলেননি কিন্তু নিউজ পেপারের পেজ থ্রি রিপোর্টারকে নির্ঘাৎ বলেছেন আজকের ট্যাবলয়েডেই দেখলাম মনে হল চিন্তা করবেন না সিপি প্রোটেকশান দিয়ে দেবেন একটু অসহায় অসহায় মুখ করে বলতে হবে কিন্তু সামনে নাহলে দুর্গাপুজা আছে, আমাদের ম্যানপাওয়ার তো বেশি নয়
অভিনেত্রীটি কানাই এর দিকে কৃতজ্ঞতাসুলভ দৃষ্টিতে তাকালেন কানাই দেখেও না দেখে জয়েন্ট সিপির ঘরে ঢুকে গেলেন ওক কাঠের বিস্তৃত টেবিলের ওপাশে জয়েন্ট সিপি বসে আছে তার মুখোমুখি, টেবিলের অন্যপ্রান্তে, কানাই এর দিকে পিঠ করে আরেক উর্দিধারী বসে ছিলেন কানাই কাঁধের ব্যাজ দেখে বুঝলেন-ডেপুটি কমিশনার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট কানাই এর ঘরে ঢোকার শব্দ শুনেও তিনি পিছন ঘুরে দেখলেন না কানাই এতে আরো উৎফুল্ল হলেন ডিসি ডিডি এর অমতেই তাহলে সিপি ক্রাইম বাধ্য হচ্ছেন সাসপেনশান তুলে নিতে
কানাই সিপি ক্রাইমকে বললেন-খুব ক্রিটিকাল কেস কি স্যার?
সিপি ক্রাইমের বয়েস কানাই এর সমান গায়ের রং মাজা, চোখের মনি দুটো উপর দিকে ঠেলা, তাতে তাঁর পদের ভার কিছু বৃদ্ধি পেয়েছে দেহের গড়ন  ভারির দিকেই প্রেসিডেন্সির ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন কানাইকে বললেন- বুঝে নিয়েছেন তাহলে যাক এক্ষুনি ক্রাইম সিনে চলে যান তাহলে
-চলে তো যাব স্যার, কিন্তু কোন কেস স্যার! খবরের কাগজে তো কোন মেজর ইনসিডেন্ট দেখলাম না কাল রাতের দিকে হল নাকি আমার বাড়িতে নিউজ পেপারের মফস্বল সংস্করণটা আসে, তাই লেটেস্ট খবরগুলো পাই না
সিপি ক্রাইম বিরক্ত হয়ে বললেন-ওঃ জানেন না তাহলে, আন্দাজে বললেন?
-ক্রিটিকাল কেস এলেই স্যার ডিপার্টমেন্টের আমাকে মনে পড়ে কিনা। বলে কানাই ডিসি ডিডি এর দিকে তাকালেন তিনি তখন টেবিলের উপর রাখা পেপারওয়েট ঘোরাচ্ছিলেন কানাই বুঝলো, কেসটা পাবলিক মাইন্ডে এফেক্ট ফেলতে পারে রাতের ইন্সিডেন্ট যদি হয়, তবু এতক্ষণে টিভি বুলেটিনে এসে যাওয়ার কথালালবাজারে কানাঘুষো শুরু হয়েও যাবে। কিন্তু সৌভিক তাকে কিছু বলেনি অর্থাৎ লালবাজার থেকে মিডিয়াকে এখনও অবধি সেন্সার করা হচ্ছে পরে সিলিকটিভ লিক দেওয়া হবে যাতে মানুষজন উদবিগ্ন না হয়
সিপি ক্রাইম টেবিলে চাপড় মেরে বললেন-ডবল হোমিসাইডের কেস নর্থ ক্যালকাটায় একটা পাইস হোটেলে ভাত খেতে খেতে দুটো ছেলে টেবিলের উপর লুটিয়ে পড়ে ইনিশিয়ালি লোকজন ভেবেছিল, খাবারে কিছু আছে, ছেলেগুলো অসুস্থ হয়ে পড়েছে বি আর সিং হাসপাতালে বডি দুটো ট্রিটমেন্টের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ওরাই ডেথ কর্নফার্মড করেছে কাল রাতের ঘটনা লোকাল থানা কাল রাতে কেসটা দেখছিল আজ সকালে ডিডি কেসটা নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছেন
কানাই প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল, সিপি হাত তুলে কানাইকে থামিয়ে দিলেন একটা চৌকো, ছোট আর হলুদ রঙের ফ্ল্যাশ কার্ড তুলে তাতে ঘষঘষ করে লিখে কানাই এর দিকে এগিয়ে দিলেন
-এই যে  আর অ্যাড্রেস করতে পারবো না দেখছেন তো, বাইরে লোকজন বসে আছে
কানাই জিজ্ঞেস করলো-আমার সাসপেনশানটা কি তাহলে উঠে গেল স্যার
সিপি ক্রাইম হতাশ গলায় বললেন-সেটাও কি বলে দিতে হবে, বুঝে নিন ভাই

কানাই ঘরে এসে দেখলেন সৌভিক পকেটে সানগ্লাস আর হাতে তিন তিনখানা স্মার্টফোন নিয়ে বেরবার জন্য তৈরিই হয়ে বসে আছে কানাই ঠিকানা লেখা এডড্রেস টা সৌভিকের টেবিলে ছুঁড়ে দিলেন
সৌভিক জিজ্ঞাসা করলো-লোকাল থানাকে ইনর্ফম করতে হবে?
কানাই ড্রয়ার খুলে নিজের ধুলো পড়ে যাওয়া নেমপ্লেটটি বের করলেন, মুছে টেবিলের উপর রেখে একটা আঙুল বুলিয়ে, সৌভিকের দিকে তাকালেন- লোকাল থানা বোধহয় আমহার্স্ট স্ট্রিট থানা ইনফর্ম কর যে আমরা যাচ্ছি ইনভেস্টিগেটিং অফিসার যেন অবশ্যই থাকে আর ফরেন্সিকের কাউকে আর ফটোগ্রাফারকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সিনে পৌঁছতে বল
সৌভিক ফোন করতে যাচ্ছিল, কানাই বাধা দিলেন গাড়িতে উঠে ফোন করবি এখন ঝটপট চল কাল রাতের ক্রাইম সিন, এখন যে কি কন্ডিশানে আছে ভগবান জানেন
লালবাজারের চাতালে লালবাতি লাগানো টয়েটা কোয়ালিস কানাই আর সৌভিকের জন্য অপেক্ষা করছিল গাড়িটিকে দেখে কানাইচরণ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন সাসপেনশানের দিনগুলো বাসে ট্রামে জার্নি করতে হয়েছে সরকারি চাকরির এটুকুই তো সুখ সৌভিককে সেন্টিমেন্টটা বুঝতে দিলেন না হুটার বাজিয়ে গাড়ি ছুটলো বটুক সমাদ্দার লেনের দিকে


জগমোহিনী ভোজনালয়- দিবারাত্র থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা 


বটুক সমাদ্দার লেন উত্তর কোলকাতার আর পাঁচটা মাঝারি মাপের গলির থেকে কোন ভাবেই আলাদা নয় উত্তরে মাইলটাক এগিয়ে গেলে শিয়ালদহ স্টেশান, দক্ষিণে কলেজ স্ট্রিট তার মাঝে আপাত শান্ত গলি, গলির একদিকে ত্রিফলা আলো বসেছে, আরেকদিকে খোলা নর্দমা গলির দুদিকে রঙ উঠে যাওয়া দোতলা বাড়ির সারি গলিতে বড় গাড়ি ঢুকতে পারবে না, মোটরসাইকেল বা মারুতি ঢুকে যাবে কানাইচরণদের কোয়ালিস গলির মুখে এসে থেমে গেল সৌভিক গাড়ির ভিতর বসে ফরেন্সিক এক্সপার্টের সঙ্গে ফোনে ঝগড়া করছিল লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের নিজস্ব ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ফরেন্সিক সহায়তা সেলের বিশেষজ্ঞকে তলব করেছিল সৌভিক  কিন্তু তারা এখনও লালবাজার থেকে রওনা হতে পারেনি সৌভিক তাদের শেষবারের মত তাগাদা দিয়ে ফোনটা কেটে দিল কানাইচরণ কোয়ালিস থেকে নেমে পড়লেন গলির মুখে কৌতুহলি মানুষের ভিড় সেই ভিড় ঠেলে কানাই এগুলেন, গলির মুখে কোলকাতা পুলিশের পেরিমিটার টেপ দেওয়া, একজন কনস্টেবল পাহারা দিচ্ছে কানাইচরণ আর সৌভিক পেরিমিটার টেপ তুলে গলিতে ঢুকলেন গলির মধ্যে মানুষের চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে একজন বিনা উর্দির পুলিশ কর্মি কানাইচরণকে দেখে হাসি হাসি মুখ করে এগিয়ে এসে কপালে হাত ঠেকিয়ে বললো-স্যার আমি সাব ইন্সপেক্টর ভুঁইঞা আমহার্স্ট থানার থেকে এসেছিআমি আপনাকে চিনি কিন্তুট্রেনিং-এর সময় ক্লাস নিয়েছিলেন
কানাইচরণ ভুঁইঞাকে জিজ্ঞেস করলেন- ফার্স্ট রেস্পন্ডার কে ছিলেন?
-স্যার, গন্ডোগোলের খবর শুনে,প্রথমে একটা পেট্রল ভ্যান এসেছিল আর তারপরই আমি ফোর্স নিয়ে চলে আসি সিচুয়েশান বুঝে আমি আমাদের থানার বড়বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করি কন্ট্রোল রুমের সঙ্গেও কথা হয়আমাকে কয়েকটা নির্দেশ দেওয়া হয়, আমি সেগুলো পালন করেছি যথাসাধ্য কেসটা আপনার কাছে যাবে বলেই বোধহয় আর লোকাল থানার কাউকে ইনভেস্টিগে্টিং অফিসার এর চার্জ দেওয়া হয়নি
কানাইচরণ সাব ইন্সপেক্টর ভুঁইঞাকে পিছনে রেখে গলির মধ্যে এগুলেন দুদিকের বাড়ির জানালাগুলিতে মুখের সারি সেদিকে একবার তাকালেন তারপর ভুঁইঞাকে বললেন- সাইডে সরে এসো ফরেন্সিক আসবে ভুঁইঞা বড় পদক্ষেপ ফেলে রাস্তার যেদিকে লাইটপোস্ট সেদিকে চলে এল সৌভিক কানাই এর নির্দেশ বুঝে পকেট থেকে একটা গোল লাল কার্ড বের করে রাস্তার উপর ফেলে রাখলো ফরেন্সিকের লোক এসে ফুটপ্রিন্ট আর অন্যান্য নমুনা সংগ্রহের কাজ করবে অলটারনেট লাইট সোর্স বা এ এল সি পেন চাঁদনির বাজারে ঘুরলেও পাওয়া যাবে এ এল সি পেন এর আলো ফেলে ফরেন্সিক প্রাথমিক ভাবে দেখে নেবে, তারপর দরকার মত আরো পরীক্ষাও করতে পারে
ভুঁইঞা হাতের ফোলিও ব্যাগ থেকে কাগজের তাড়া বের করে বললো-একটা প্রাথমিক রিপোর্ট বানিয়েছি স্যার, শুনবেন?
-পরে শুনবো আগে ক্রাইম সিনটা দেখে নিই কোন বাড়িটা?
-আর দুটো বাড়ি ছেড়ে, বা দিকে, সাইনবোর্ড আছে একটা
কানাই দ্রুতপায়ে দুটো বাড়ি টপকে একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাড়ালেন বাড়ির দেওয়ালে শ্যাওলা পড়েছে, চুনসুরকি খসে গিয়ে বটের চারা গজিয়েছেএককালে বাড়িটির নিশ্চই রং ছিল এখন দেওয়ালে কেবল সবজেটে ভাব রাস্তার পাশ থেকেই বাড়ির দেওয়াল শুরু হয়ে গেছে কোন বারান্দা নেই লম্বা লম্বা জানালা ওয়ালা চৌকো ঘর কানাইচরণ সানগ্লাস খুলে প্রধান দরজার উপরে তাকালেন একটি কাঠের সাইনবোর্ড খুলছে তাতে লেখা জগমোহিনী বোর্ডিং হাউস এন্ড ভোজনালয়

বাড়ির সদর দরজাটি কানাইচরণের উচ্চতার থেকে চার ইঞ্চি ছোট তিনজনেই মাথা বাঁচিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করলেন কানাই দেখলেন যে ঘরটিকে তারা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছেন সেটি দৈর্ঘ্যে প্রস্থে ছয় ফুট বাই আট ফুট আদতে একটি সিঁড়িঘর, দোতলায় উঠবার পাকা সিঁড়ি উঠে গেছে, সিঁড়ির নিচে মিটার বক্স, দলাপাকানো ইলেকট্রিক তারের জটাজুট আর অবশিষ্ট অপ্রশস্ত প্যাসেজে একটি কাঠের বেঞ্চি রাখা কানাই আন্দাজ করলেন-দোতলায় বোর্ডিং হাউস, এই সিঁড়িঘরটি জগমোহিনী হোটেলের ওয়েটিং রুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কাঠে বেঞ্চিটি সেই সাক্ষীই দিচ্ছে সৌভিক কাঠের বেঞ্চের উপর ফরেন্সিকের জন্য আরেকটি রেড কার্ড ফেলে রাখলো
সিঁড়িঘরের অন্ধকার দূর করতে দিনের বেলাতেও বাল্ব জ্বালাতে হয়েছে বেঞ্চ যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে আরেকটি দরজা, উচ্চতায় আগেরটির থেকেও ছোট দরজা আগলে পাহারা দিচ্ছে আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার দুই কনস্টেবল তারা কানাইদের দেখে সেলাম ঠুকলো কানাইও পালটা সেলাম ঠুকে সিঁড়িঘরের লাগোয়া এই একমাত্র দরজা দিয়ে ঢুকে দেখলেন পাইস হোটেলের খাওয়ার ঘর এই ঘরটি আকারে প্রকারে বেশ বড়, বলা যেতে পারে বাড়িটির অধিকাংশ জায়গা জুড়েই এই ঘরটি ঘরের মধ্যে চৌকো, কাঠের টেবিল রয়েছে দশটি একেকটি টেবিলে চারজন বসে খেতে পারে টেবিলের সঙ্গে ফ্লোন্ডিং চেয়ার আছে, কানাই ঝুঁকে দেখলেন চেয়ার আর টেবিলগুলি লোহার শিকল দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে রাখা-চুরি যাওয়ার ভয়ে কানাই পাশ ফিরে দেখলেন, দরজার পাশেই হোটেলের মালিক বা ম্যানেজারের বসার উঁচু একটি কাঠের চেয়ার আর স্ট্যান্ড স্ট্যান্ডের উপর হাতবাক্স রাখা ঘরটির অন্যপ্রান্তে আরো দুটি দরজা রয়েছে সেগুলি দিয়ে গেলে বাড়িটির পিছনের দিকে যাওয়া যাবে কানাই ভুঁইঞাকে জিজ্ঞেস করলেন- ওই ঘরদুটো কিসের?
-একটা রান্না ঘর, আরেকটা ছোট ডাইনিং রুম, সেখানে মাটিতে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে আর মালখানা রান্নাঘরের সঙ্গেই
কানাই ফের ঘরখানা দেখতে থাকলেন ঘরের দেওয়াল জুড়ে মনীষীদের ছবি, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ পুরানো দিনের সুইচবোর্ড, ওপেন ইলেকট্রিক ওয়ারিং ঘরের যে দেওয়ালটি রান্নাঘরের দিকে সেই দেওয়ালে প্রমাণ সাইজের দুটি জানালা সেই জানালা দিয়ে এতটাই আলো আসছে যে এই ঘরে দাঁড়িয়ে সিঁড়িঘরটিকে অন্ধকার বোধ হচ্ছে কানাই হোটেলটির যাওয়া আসার পথ আরেকবার ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করলেন  হোটেলটিতে দশ চারে চল্লিশজন লোকের বসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে ভিড়ের সময় আরো কিছু লোক মাটিতে বসে খেতে পারে তবু লোক বেশি হলে সিঁড়িঘরে বেঞ্চ রয়েছে, সেখানে চেপেচুপে বসলে পাঁচ জনের জায়গা হবে অপ্রশস্ত গলিতে জনাচারেক লোক দাঁড়িয়ে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করলেই যাওয়াআসার পথ অবরুদ্ধ হয়ে যাবে কেউ যদি খেতে আসে, সে বটুক সমাদ্দার লেন থেকে মাথা বাঁচিয়ে জগমোহিনীর সিঁড়িঘরে প্রথম ঢুকবে ভিড় থাকলে, বাম হাতের কাঠের বেঞ্চিটিতে বসে অপেক্ষা করবে তারপর ডাক এলে, উঠে এগিয়ে গিয়ে বামহাতেরই দরজা দিয়ে খাওয়ার ঘরে এসে ঢুকবে এবং একটি চেয়ার দখল করে বসবে রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে সার্ভার এই ঘরে এসে ঢুকবে ও পরিবেশন করবে খাওয়া হলে লোকটি উঠবে, তাকে বিল মেটাতে হবে বিল না মিটিয়ে যাওয়ার উপায় নেইকারণ খাওয়ার ঘরের দরজা আগলে ম্যানেজার বা মালিক কেউ একজন হোটেলের কর্তাবিধাতা বসে আছেন সেই ম্যানেজার খদ্দেরের থেকে টাকা নেবে, নিজের ক্যাশবাক্সে পুরবে, এর পর খদ্দেরটি যে পথে এসেছিলো সেই পথেই চলে যাবেসুতরাং, ক্যাশবাক্স আগলে যে বসে আছে, সে গোটা ডাইনিং রুমকেই দেখতে পাচ্ছে, কারা ডাইনিং রুমে ঢুকলো আর বেরুলো এইটেও তার জানা কিন্তু সে শুধু জানেনা, ভিড়ের সময়, সিঁড়িঘরে কারা বসে অপেক্ষা করছে আর কারাই বা ভুখা পেটে বটুক সমাদ্দার লেনে দাঁড়িয়ে চেয়ারটেবিল ফাঁকা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে কানাইচরণ হোটেলের অর্গানাইজেশান বুঝতে পেরে সন্তুষ্ট হয়েই গেছিলেন, কিন্তু মনে হলো, একটা অংশ তবু যেন বলা হল না এবার তাই মনে মনে না ভেবে তিনি ভুঁইঞার দিকে তাকিয়ে ফের গোটাটা আরেকবার বললেন পাশ থেকে সৌভিক সব শুনে বললো-সব ঠিকই আছে কিন্তু যারা খেয়ে উঠলো তারা হাত কোথায় ধোবে
কানাই আফসোস করে বলে উঠলেন-ইস, তাইতো, বেসিনেও একটা রেড মার্ক ফেলিস
ভুঁইঞা বললো-ওই বসে খাওয়ার ঘরে একটা বেসিন আছে স্যার জলের কানেকশান আছেআর রান্নাঘরের মেঝেতে একটা টেপাকল পোঁতা আছেএবাদে আর জলের লাইন দেখিনি
সৌভিক গেল জলের লাইনগুলিতে রেড মার্ক মারতে কানাইচরণ হোটেলের মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসলেন মেঝেময় ভাতের টুকরো, ডালের দাগ, রান্না করা সবজির অংশ পড়ে আছে রাতে মেঝে মোছার সুযোগ স্বাভাবিক ভাবেই হোটেলের কর্মচারিরা পায়নি কানাইচরণ আরো ঝুঁকে টেবিলে আর চেয়ারের সারির মধ্যে দিয়ে দেখার চেষ্টা করলেনখালি চোখে তার চোখে কিছু পড়লো না কোথাও রক্তের দাগ নেই পিপড়ের সারি দেখতে পেলেন, বাসি খাবার খেতে এসেছে ইঁদুরও থাকতে পারে, মানুষের পায়ের শব্দ পেয়ে লুকিয়েছে কানাই উঠে দাঁড়িয়ে এইবার চেয়ার টেবিলগুলির দিকে তাকালেন টেবিলের অবস্থা মেঝের থেকেও খারাপ থালা, বাটি আর গ্লাস ছড়িয়ে আছে টেবিলের উপর, অর্ধভুক্ত খাবার শুকিয়ে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে খোলা জানালা দিয়ে মাছি এসে ভনভন করছে কানাইচরণ সৌভিকের কাছ থেকে লেটেক্স এর দস্তানা চেয়ে নিলেন সৌভিক নাক উঁচু করে গন্ধ শোকবার চেষ্টা করলো খাবার পচে যাওয়ার গন্ধ পেল কানাইচরণ বাকিদের এগোতে মানা করে কেবলমাত্র নিজে এগিয়ে গেলেন ঘরের মাঝামাঝি একটি টেবিলের দিকে এই টেবিলটি দূর থেকে তার চোখে পড়েছিল অন্যান্য টেবিলের মত বাসি থালাবাসন এই টেবিলে নেই কানাই দুই লাফে এসে দাঁড়ালেন টেবিলটির পাশে টেবিলের উপর কোনাকুনি চক দিয়ে দুটো গোল দাগ দিয়ে রাখা কানাই ভুঁইঞাকে জিজ্ঞেস করলেন- ভিক্টিমরা এই টেবিলে বসেছিল?
-হ্যাঁ স্যার, মুখোমুখি, কিন্তু সাইড করে মার্ক করে রেখেছি
সৌভিক  জানতে চাইলো-কোন গ্যাসের লাইন এই বাড়ির উপর দিয়ে গেছে কি?
-কাল রাতে দেখে তো মনে হল না আরেকবার ভালোভাবে চেক করতে হবে ভুঁইঞা জানালো
কানাই দরজার দিক থেকে মাথা ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন হাত মাটির আনুভূমিক অবস্থায় এনে আন্দাজ করার চেষ্টা করলেন জানালার গ্রিল ছোঁবার ব্যর্থ হলেন সৌভিক বললো- ফুট দুয়েক এর ডিস্টেন্স হবে, জানালা থেকে টেবিলটার আর তাছাড়া জানালার পাশে আরেকটা অন্য টেবিলও আছে!
কানাই ফের দুই লাফ দিয়ে পুরানো অবস্থানে ফিরে এলেন, ঘরে ঢুকবার দরজার পাশে ভুঁইঞা জিজ্ঞেস করলো- রান্নাঘরটা একবার দেখবেন স্যার?
কানাই মাথা নাড়লেন-পরে, আগে ফরেন্সিক আসুকতারপর যা আরেকবার ভালো করে দেখে নেব এখন বাইরে চলো

অলংকরণঃ লেখক 



লেট নাইট ডবল হোমিসাইড
তিনজনে জগমোহিনী ভোজনালয়ের উল্টোদিকের বাড়ির রোয়াকে এসে বসলো সৌভিক আর কানাই নেভিকাট ধরালো, ভুঁইঞা নিতে চাইলো না কানাই একটা টান দিয়ে রোয়াকে পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে বসলেন
- তা বলো ভুঁইঞা, একদম শুরু থেকে শেষ অবধি, যতদূর তুমি জানো, যা যা কাল রাতে দেখেছো এইটে ধরেই বলবে যে আমি কিন্তু কিচ্ছুই জানিনা আর ওই তোমার ইনিশিয়াল রিপোর্ট মুখস্থ করে বোলোনা বাপু ওই রিপোর্ট আমি পরে পড়ে নেব
ভুঁইঞা অনেকখানি বাতাস ফুসফুসে নিয়ে বলতে শুরু করলো
-এই যে দেখছেন জগমোহিনী হোটেল, এই অঞ্চলের অনেকদিনের পুরানো পাইস হোটেল যেসব স্টুডেন্ট মেসে থেকে পড়াশুনা করে তারা খেতে আসে, দিনের বেলা অফিস কাছারির লোকজনও খায় একতলায় হোটেল আর দোতলায় জগমোহিনীরই বোডিং হাউস চার পাঁচটা ছেলে মেস করে থাকে, জগমোহিনীর কর্মচারিরাও সময়ে অসময়ে থাকে হোটেলের মালিকের নাম শ্যামকান্ত মাঝি, মালিক কাম ম্যানেজার তার ঠার্কুদা এই বাড়িটা ভাড়া নিয়ে হোটেল খুলেছিল, তারপর নিজেরাই প্রোপার্টিটা কিনে নেয় আগে কখনও আমাদের কাছে হোটেলের নামে খারাপ কোন ইনফর্মমেশান আসেনি, এই পাড়াটাও চুপচাপ নেশাখোরদের একটু উপদ্রব আছে ছিঁচকে চুরি অবধি, তার বেশি নয় কালকের ঘটনাটা তাই একেবারেই, যাকে বলে, আনএক্সপেক্টেড কাল রাত সাড়ে দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে দুটি ছেলে জগমোহিনীতে খেতে আসে ছেলেদুটি মালিকের মুখচেনা, খাতায় খায় সেই সময় কাস্টমারদের ভিড় ফাঁকা হয়ে আসছিল এমনিতেই সন্ধের ভিড় দুপুরের ভিড়ের থেকে নাকি কম থাকে লোকাল ছেলেরা শুধু খায় ছেলেদুটি তাই আসামাত্র খেতে বসার জায়গা পেয়ে যায় খাওয়ার ঘরের মাঝখানের টেবিলটিতে মুখোমুখি বসে আপনি তো স্যর লক্ষ্য করেছেন, দুজনে একেবারে মুখোমুখি বসেনি, বসেছিল টেবিলের কোনাকুনি মাছভাতের থালি খাচ্ছিলো এরা ছাড়াও ঘরে আরো গোটা কুড়ি লোক খাচ্ছিলো মনোহর নামে একটি ছোকরা সার্ভার আর নরেন নামে একটা আন্ডারএজ ছেলে খাবার পরিবেশন করছিল মনোহরকেই জগমোহিনীর ম্যানেজার বলা চলে শ্যামকান্ত-র একমাত্র ছেলে শ্যামকান্তের বয়েস সত্তর হবে, ক্যাশে বসে নরেন মাছ দিয়ে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে দেখতে পায় ছেলেদুটি ভয়ঙ্কর ভাবে কাঁপছে, মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরচ্ছে, চোখ এর মণি সাদা হয়ে গেছে আশেপাশের টেবিল থেকে লোকজন উঠে ধরতে যাবে কি যাবে না, ছেলেদুটো থালার উপর মুখ থুবড়ে পড়ে তারপর স্যার, যা হয় আর কি, রোমান মব...উত্তেজিত জনতা...কেউ ছুটেছিল ট্যাক্সি ডাকতে, কেউ পুলিশে খবর দেয়কেউ আবার মনোহরকে ধরে চড় চাপড় মারা শুরু করে দেয়তবে অনেক কাস্টমারই এদের পরিচিত তারা সামলানো শুরু করে খাবারে কিছু থাকলে তো আর শুধু দুজন অসুস্থ হবে না যারা খাচ্ছে সবার হবে যাই হোক, এর মধ্যেই ট্রাফিক এর একটা পেট্রোল কার এসে পড়ায় পরিস্থিতি আয়ত্তে আসে ছেলেদুটো তখনও সেন্সলেস পেট্রোল অ্যাম্বুলেন্সকে খবর দেয়, ইন দা মিন টাইম আমিও ফোর্স নিয়ে এসে পড়ি আর সঙ্গে সঙ্গে সব উইটনেসকে জগমোহিনী লিভ করতে মানা করে দিই যারা ট্যাক্সি ডাকতে গেছিল তারাও মিনহোয়াইল ফিরে আসে ট্যাক্সি নিয়ে ছেলেদুটোকে বি আর সিং-এ নিয়ে যাওয়া হয় আমি একবার পালস দেখেছিলাম, পাইনি, যাইহোক ফাইনালি হসপিটালে এক্সপায়ার্ড বলে ঘোষনা করে আমি জগমোহিনী ছাড়িনি লালবাজারের কন্ট্রোল রুম তখন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে বলে যে ছেলেদুটো মারা গেছে আমাকে প্রাথমিকভাবে কি কি করতে হবে তার একটা গাইডলাইনও দেওয়া হয়েছিল
- কি কি গাইডলাইন বলেছিল লালবাজার? কানাইচরণ জানতে চান
-স্যার, ছেলেদুটোর পরিচয় জানতে হবে ইনিশিয়াল সাসপেক্টদের ধরে রাখতে হবে ফরেন্সিক পাঠাচ্ছিল লালবাজার, তার আগে যেন ক্রাইম সিন কোনভাবে কেউ নষ্ট না করতে পারে এইসব, আমি এক এক করে কাজ করা শুরু করে দিই ছেলেদুটোর পরিচয় হল, দুজনেই স্থানীয় লকলেজের ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট একজনের রজনীকান্ত মন্ডলবয়েস বাইশ, বাড়ি বাঁকুড়াতে আরেকজনের নাম সহদেব বর্মণ, তেইশ, বাড়ি জলপাইগুড়িদুজনেই নিউ এজ বোর্ডিং হাউসে থাকে,রুমমেট, বটুক সমাদ্দার লেন থেকে বেরিয়ে দুটো গলি ছেড়ে ডাইনে ঘুরলেই নিউ এজ বোর্ডিং, ওয়াকিং ডিসটান্স বলা যেতে পারে বোর্ডিং এর ছেলেদের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তায় বুঝতে পারি, ইনোসেন্ট ছেলে, পার্টি পলিটিক্স করে না ড্রাগ এ্ডিকশানের কোন প্রবলেম ছিল বলে মনে হয় না এদিকটা সামলে তারপর স্যার আমি সন্দেহভাজন আর সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করি ততক্ষণে মিডনাইট পেরিয়ে গেছে সবাইকে জগমোহিনীর দোতলায় আটকে রেখেছিলাম আমার মনে হচ্ছিলো যে হয় ফুড পয়জনিং নয়ত খাবারে বিষ মেশানো হয়েছে আমার সন্দেহ তাই স্বাভাবিক ভাবেই গিয়ে পড়ে বটঠাকুরের উপর বটঠাকুরকে হেল্প করার জন্য দুজন মশালচি আর একটা হেল্পার আছে আর আছে বাসন মাজার দুজন ঝি কিন্তু দেখলাম বটঠাকুরের উপর মালিকের অগাধ বিশ্বাস বটঠাকুরের এই হোটেলে দশ বছরের বেশি হয়ে গেছে কোনদিনও অভিযোগ নেইএকটু নেশাটেশা করার দোষ আছে ধরবার মধ্যে কিন্তু তাই বলে খাবারে বিষ মেশাবে সেইটে হবার নয় এদিকে আবার বটঠাকুর বলছে, অন্য কর্মচারি কেউ বিষ মেশালে তার চোখে ঠিকই পড়বে বটঠাকুরের চোখ গলে রান্নাঘরে মাছিও গলে না শ্যামকান্ত আর মনোহরকে জেরা করে জেনেছি সেসময় হোটেলে বিশেষ ভিড়ও ছিল না আর গলিতেও ভিড় পাতলা হয়ে এসেছিল তাই জানালা দিয়ে কেউ বিষ ছুড়ে দেবে সেটাও বেশ অসম্ভব ছোকরা বয় নরেন বললো, সে এই দুটো লোককে ছাড়া টেবিলে আর কাউকে দেখেনি দুজন কাস্টমারেরও জবানবন্দী নিয়েছি, তারাও একই কথা বলছে আমি শেষরাতের দিকে তাই কন্ট্রোলরুমকে জানিয়ে বটঠাকুর, শ্যামকান্ত, মনোহর আর নরেনকে বাদ দিয়ে বাকিদের নাম ঠিকানা লিখিয়ে ছেড়ে দিই এই চারজনকে থানায় নিয়ে গেছিলাম এখন আবার নিয়ে এসেছি, গাড়িতে বসিয়ে রেখেছি, আপনি অর্ডার দিলেই নিয়ে আসবো
-গুড এবার ফরেন্সিকের ব্যাপারটা বলো, কখন ফরেন্সিক এলো আর ক্রাইম সিন তুমি কি রকম দেখেছো?
- স্যার এই জিজ্ঞাসাবাদের মাঝেই ফরেন্সিকের একজন আসেন খুবই বয়েস অল্প তার, আমি আর কিছু জানতে চাইনি, মনে হল কোন ট্রেনি হবে হয়তবা রাতের বেলা কোন এক্সপার্টকে না পেয়ে পাঠিয়েছে সেই ছেলেটিই স্যাম্পেল কালেক্ট করে নিয়ে গেছে ক্রাইম সিন আমি দেখারই চেষ্টা করিনি হোটেলের খাওয়ার ঘর, রান্না ঘর আর ছোটঘর থেকে সবাইকে প্রথমেই সরিয়ে দিয়ে দুটো পুলিশ বসিয়ে দিয়েছিলাম আপনি ট্রেনিং এর সময় বলেছিলেন স্যার, ফরেন্সিক না আসা অবধি এমনকি পুলিশও যেন ক্রাইম সিনে না ঢোকে, যার যেটা কাজ আর কি!
কানাইচরণ সিগারেটের ধোঁয়ার রিং ছেড়ে বললেন- তা খুব ভালো করেছো কি স্যাম্পেল নিয়েছে দেখেছো?
- খুব সিরিয়াসলি কিছু দেখিনি স্যার, তবে ভিক্টিমদের থালাবাসন আর না খাওয়া গোটা খাবারটাই নিয়ে গেছে রান্নাঘরের খাবারের স্টক থেকেও বোধহয় স্যাম্পেল নিয়েছে আসলে তখন অনেকটা রাত হয়ে এসেছিল, আমারও আর এনার্জি ছিল নাএমনিতেই কাল আমি ওভারটাইমে ছিলাম
কানাই সিগারেটটা রোয়াকে ঘষলেন, সৌভিককেও তার হাতের সিগারেট ড্রেনে ফেলতে দিলেন না সৌভিক ভুল বুঝতে পেরে রোয়াকে সিগারেট ঘষলো আর ড্রেনের ধারে ফরেন্সিকের জন্য একটা রেড মার্ক ফেলে রাখলো
কানাইচরণ সাব ইন্সপেক্টর ভুঁইঞাকে বললেন- সাসপেক্টদের কি এরেস্ট করেছো?
-না স্যার, আপনার পারমিশান ছাড়া আমি কোন স্টেপ নিচ্ছি না
-গাড়িতে বসিয়ে রেখেছো বললে না? হাজির করাও


জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব

কানাই এর নির্দেশ পেয়ে সাব-ইন্সপেক্টর ভুঁইঞা গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশকর্মিটিকে চেঁচিয়ে বললো-নিয়ে আয়!
বড়রাস্তায় পুলিশের জিপ থেকে জগমোহিনীর মালিক শ্যামকান্ত, তার ছেলে মনোহর, বটঠাকুর আর ছোকরা সার্ভার নরেনকে নামিয়ে দুজন পুলিশ গলিতে ঢুকলো চারজনকে এখনও হ্যান্ডকাফ পরানো হয়নি, কোমরে দড়ি পরেনি সাব-ইন্সপেক্টর ভুঁইঞা এদের আটকে রেখেছে ঠিকই কিন্তু সন্দেহের লিস্টে রাখেনি চারজনের উপরেই রাতজাগার ধকল পড়েছে, কিন্তু শ্যামকান্ত বৃদ্ধ, গোটা ঘটনায় হোটেলের মানসম্মান জড়িয়ে গেছে, কানাইচরণের সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছিল মনোহরকে আর নরেনকে দেখে কানাই এর মনে হলো, এই দুজন যথেষ্ট শক্ত আছে আর চাইলে এদের দুজনের পক্ষে খাবারে বিষ মিশিয়ে দেওয়াও অসম্ভব নয় বটঠাকুরকে দেখে মনে হলো, দু দুটো মানুষের মৃত্যুর ধকলের চেয়ে নিজের নেশার জোগানে ঘাটতি কাবু করে রেখেছে
কানাইচরণ চারজনের পরিচয় জানতে চাইলেন আর ঘরপরিচয় বিষয়ে দুচারটে মামুলি কথার মধ্যে দিয়ে চারজনকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন শ্যামকান্ত হাত জোড় করে জবাব দিচ্ছিল
কানাইচরণ জানতে চাইলেন- আগে এই হোটেলে এরকম কিছু হয়েছে?
-কোনদিনও না বাবু, সত্তর বছরের সেবা শ্যামকান্ত জবাব দিল
কানাই আঙুল উঁচু করে হোটেলের ঘরের দিকে দেখিয়ে জানতে চাইলেন-হোটেলে তো বেশ পোকামাকড় আছে দেখলাম, এদের মারতে বিষ দেওয়া হয় নাকি?
- ব্লিচিং দিই হুজুর রাতের বেলায়কাস্টমাররা চলে গেলে কোনদিনও কমপ্লান আসেনি
-আর ইঁদুর মারতে?
-খাঁচা পাতিআর ওই ড্রেনে ব্লিচিং দিইএখানে সব বাড়িতে ইঁদুর , বাবু
কানাই আরো গোটা দুই মামুলি প্রশ্ন শ্যামকান্তকে করে তারপর মনোহরকে জেরা করা শুরু করলেনমনোহরের গায়ে গতরাতের স্যান্ডোগেঞ্জি, সে কানাই এর চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে ছিল
কানাই জিজ্ঞেস করলেন- কাল ওই দুটো ছেলে কি কি অর্ডার করেছিল?
মনোহর জবাব দিল-মাছের থালি
-কি কি থাকে তাতে?
-মাছ, ডাল, আলুভাজা আর একবার ভাত
-একবারই ভাত নিয়েছিল?
-আরেকবার নেওয়ার চান্স পায়নি মনোহরের উত্তর শুনে সাব-ইন্সপেক্টর ভুঁইঞা থাপ্পর মারতে যাচ্ছিলেন- সাহেবের কথার ভালোভাবে উত্তর দে, নাহলে মার্ডার কেস দিয়ে লাইফ হেল করে দেব কানাই থামতে বললেন মনোহর চোখ নামিয়ে নিল
কানাই- ওদের টেবিলে আর কেউ ছিল?
-না সার
-আগে পরে কেউ আসেনি?
-সব সময়ই লোক আসছে যাচ্ছে নাঃ ওদের সঙ্গে কেউ তো ছিল না টেবিলে দুজনই ছিল নারে? বলে মনোহর সার্ভার ছোকরা নরেনের দিকে তাকালো নরেন মাথা নাড়লোআর কেউ ছিলনা
কানাই এর আর মনোহরকে কিছু জিজ্ঞেস করার ছিল না তিনি তাই নরেনকে পরের প্রশ্ন করলেন
-আমি যদি তোদের হোটেলে খেতে এসে মাছভাত অর্ডার করি, তুই সেটা কিভাবে থালায় সাজিয়ে দিবি? বাটিতে মাছ দিবি, নাকি পাতে?
নরেন প্রশ্ন বুঝতে পেরেছে, সে বললো-তুমি দাদাবাবুর কাছে মাছ ভাত চাইলে আমি প্রথমে গিয়ে থালায় ভাত বাড়বো বাটিতে ডাল দেব, আরেকটা বাটিতে মাছের ঝোল দেব থালায় আলুভাজা দেবলেবু লঙ্কা দেব
-মাছের ঝোল শুধু? মাছ দিবিনা?
-মাছ ভাজা হলে বাটিতে দিয়ে যাবো
শ্যামকান্ত নরেনের কথার মাঝে বলে উঠলো-বাবু এই হোটেলের নিয়ম এই বাটিতে শুধু ঝোল দেওয়া হয় আর তাজা মাছ ভাজা হলে একটা রেকাবিতে রেখে কাস্টমারদের সামনে এনে রাখা হয় কাস্টমাররা এঁটো হাতে দেখায় যে কোন পিসটা নেবেআমরা সেটাই তাদের দিই এটা আমাদের এই অঞ্চলে স্পেশালিটি
কানাই বললেন-বাঃ দারুণ ব্যাপার তো! তা তুই এই যে ভাত ডাল মাছের ঝোল এইগুলো বাটিতে দিলি, এগুলো কি রান্নাঘরে গিয়ে নিয়ে আসতে হলো?
এবার মনোহর নরেনকে বলতে না দিয়ে বললো-সার, ওকে রান্নাঘরে যেতে হয় না রান্না ঘর থেকে খাওয়ার ঘরে বালতি করে খাবার এসে যায়আমরা শুধু সার্ভ করি
কানাই জগমোহিনীর খাবার পরিবেশনের রীতি বুঝতে চাইছিলেন, তার কাছে এখন অনেকটাই পরিষ্কারআর ভুঁইঞার কথার সঙ্গে এদের কথার ফারাক নেই বটঠাকুরকেও আর জিজ্ঞাসা করার কিছু নেই এমনিতেই বেচারার চোখ ঢুলে আসছে যদিও বটঠাকুরই এখনও অবধি প্রধান সন্দেহভাজন ফরেন্সিক এসে এদের পা থেকে মাথা অবধি গবেষণা করলে এমনিতেই বেরিয়ে আসবে যদি এদের মধ্যে কেউ নিজের হাতে বিষ মিশিয়ে থাকে ফরেন্সিক না আসা অবধি কানাইচরণ হোটেলের এই চার লোকের সঙ্গে গল্প জুড়লেন কার বাড়ি কোথায়, রোজ রাতে আর দিনে কত লোক হয়, কতজনা খাতায় খায়, এইসব সৌভিক এতক্ষণ নোটবুকে জেরার তথ্য লিখে রাখছিল, কানাইকে খেজুরে আলাপ জমাতে দেখে সে একবার ক্রশ-চেক করতে ফের জগমোহিনী ভোজনালয়ের ভিতর ঢুকলো সিঁড়িঘর পেরিয়ে বা দিকের দরজা দিয়ে খাওয়ার ঘরের মুখে এসে দাঁড়ালো কোন কাস্টমার এই ঘরে ঢুকলেই তার প্রথম চোখে পড়বে দেওয়ালে টাঙানো কাঠের বোর্ডে লেখা মেনু জগমোহিনীর বাড়ির অবস্থা যতই পড়তির দিকে হোক না কেন, মেনুর বোর্ড নিয়মিত বার্নিশ করানো হয়, খয়েরি বোর্ডের উপর সাদা রঙের তুলির টানে খাবারের নাম আর দাম লেখা সবার উপরেই মাছ ভাতের থালি, চল্লিশ টাকা সবজির থালি, মাংসের থালি আর মুরগির থালি এরপর ছানার ডালনা, বড়ির ঝোল, কাটাপোনার ঝোল শেষে এসে চাটনি, দু তিনরকম সৌভিক ঘরের আরেককোণের দিকে তাকালো, যেখানে রান্নাঘরে ঢুকবার দরজা দেওয়ালে খাঁজ, দু তিনটে স্টেইনলেস স্টিলের বালতি রাখা তার উপর এখন মাছির ঝাঁক বালতিগুলোর পাশে পরিষ্কার থালা সাজিয়ে রাখা সৌভিকের মনে হল, হোটেলের লোকজন হয়ত মিথ্যে বলছে না খাওয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সৌভিক সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে এল সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এই তাকে থামতে হল দোতলার ঘরে তালা দেওয়া প্রহরারত পুলিশকর্মীটি সৌভিককে জানালো-দুজন বোর্ডার ছিল, তারা সকালে কলেজে বেরিয়েছে, ছোটবাবু অর্থাৎ ভুঁইঞা বোর্ডারের গতিবিধিতে মানা করেনি সৌভিক আন্দাজ করলো, বোর্ডারগুলো ভয় পেয়ে পালিয়েছে সৌভিক সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে আবার যখন বটুক সমাদ্দার লেনে এসে দাঁড়ালো সেই সময়ই দুজন লোক গলির মুখে পেরিমিটার টেপ টপকে কানাইচরণের দিকে এগিয়ে আসছিল কানাইও তাদের দেখে শ্যামকান্তদের ছেড়ে গলির মুখের দিকে হাঁটা দিলেন


অতঃপর ফরেন্সিক

নতুন দুই ব্যক্তিই কানাই ও সৌভিকের পূর্বপরিচিত প্রথমজন লালবাজারে গোয়েন্দা বিভাগের নিজস্ব ফরেন্সিক সেলের ডেপুটি ডিরেক্টর মিস্টার মাইতি আর অন্যজন তারই অধস্তন, ফটোগ্রাফার শিবু মি মাইতি দীর্ঘদিন স্টেট ফরেন্সিক ল্যাবে ছিলেন, পুলিশমহলের পরিচিত মুখ লালবাজারে তার কাজের খ্যাতি আছে তার চুলের লম্বা পাকগুলো যেন শুধুমাত্র তার বয়সের কারণে নয়, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তাকে প্রাজ্ঞ করেছে ছিপছিপে লম্বা চেহারা মিস্টার মাইতির, হাতে ব্রিফকেস, ফরেন্সিক কিট অন্যদিকে শিবু এই সেদিনও ফটোগ্রাফির স্টুডিও চালাতো, পরীক্ষা দিয়ে বছর দুই হল সার্ভিসে ঢুকেছে লালবাজারে সবেধন নীলমনি ফরেন্সিক ফটোগ্রাফার বলতে এই শিবুই, সারাদিন কোলকাতার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত চরকিপাক খেতে হয় বটুক সমাদ্দার লেনের ছবি তুলেই দৌঁড়তে হবে সাউথে
কানাইচরণ লালবাজারের ফরেন্সিকে লোকের অভাব আর তাদের ব্যস্ততা সম্পর্কে অবগত তবু কানাই নিজের বিরক্তি আর রাগ গোপন করতে পারলেন না গতকাল রাতে ঘটনার পর ক্রাইম সিনে যেভাবে একজন ইন্টার্নকে পাঠানো হয়েছে সেটাকে ক্যালাসনেস ছাড়া আর কিছু বলা চলে না কানাই আর সৌভিককে একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে মি মাইতি গলা চড়িয়ে, হেসে বললেন- শুধু আমিই আসিনি,অটোপসি রিপোর্টটাও নিয়ে এসেছি ফুড স্যাম্পেল টেস্টিং ও হয়ে গেছে
কানাই নিজের বিরক্তি আর রাগ গিলে জানতে চাইলো- কিসের বিষ দিয়েছে?
-মোস্ট কমন ইন দা সাব কন্টিনেন্ট! রোডেন্ট কিলার, মানে ইঁদুর মারার বিষ
সৌভিক চমকে উঠে কানাই এর দিকে তাকালো, খানিক আগেই হোটেলের মালিক শ্যামকান্তকে কানাই ইঁদুর এর বিষের কথাই জিজ্ঞেস করছিলো কানাই আড়চোখে সৌভিককে দেখলেন
মিস্টার মাইতি বলে চললেন- তবে বাজারে বিক্রি করা ইঁদুর মারার বিষ নয়, একদম ভালো কোয়ালিটির এলুমিনিয়াম ফসফাইড দিয়েছে আমরা একে রাইস ট্যাবলেট বলি হাট বাজারের লোকেরা রাইস ট্যাবলেট কিনে তার সঙ্গে নানা রকম সাপ্লিমেন্ট মিশিয়ে ইঁদুরের বিষ বানায় খুব টক্সিক, ভারতীয় উপমহাদেশে টোটাল বিষে মৃত্যুর মধ্যে বলা যায় ফিফটি পার্সেন্টেরই কারণ ইঁদুর মারার বিষ
কানাই জিজ্ঞেস করলেন- ভিক্টিমদের জামা কাপড়ে আর গায়ে হাতে এলুমিনিয়াম ফসফাইডের ট্রেস পাওয়া গেছে?
-হাতে পাওয়া গেছে তারা যে থালা থেকে খাবার খাচ্ছিলো, সেই স্যাম্পেলে ট্রেস আছে তাই বলা যেতে পারে তারা নিজের হাতেই বিষ নিয়েছে আর, আগে বা পরে কোন জায়গায় নয়, এই হোটেলে খেতে বসেই পয়জন গিলেছে বাই দ্য বাই, হোটেলের রান্নাঘর থেকে যে স্যাম্পেল কালেক্ট করা হয়েছিল তাতে কিন্তু বিষ নেই সেটা থাকলে, অবভিয়াসলি, ক্যাজুয়ালটি অনেক বেশি হত
-আর ভিক্টিমদের জামাকাপড়ে? মানে কিসে করে বিষটা তারা বয়ে আনলো? জিভের নিচে রেখে তো আর খেতে আসেনি নিশ্চই
-ভিকটিমদের জামাকাপড়ে কোন ট্রেস নেই, কিসে করে তারা বয়ে আনলো, আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারবো না তবে হোটেলের খাবারে নেই, ভিক্টিমদের থালায় শুধুমাত্র বিষ আছে, আবার ভিকটিমদের হাতে ছাড়া শরীরের কোথাও কোন ট্রেস নেই-সব মিলিয়ে বলা যায় সুইসাইড এটেম্পট নয় নিঃসন্দেহে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে
সৌভিক মিস্টার মাইতির কথা শুনতে শুনতে হোটেলের চার কর্মচারির দিকে বারবার তাকাচ্ছিলো তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে মিস্টার মাইতির কথা শুনতে পাওয়া যাবে না তাদের চোখেমুখেও উৎকন্ঠার চিহ্ন আর রাত জাগার ক্লান্তি সৌভিক সেদিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে, নিচু গলায় মিস্টার মাইতির কাছে জানতে চাইলো- বিষের পরিমান কতটা?
-পিপিএমটা রিপোর্টে আছে, এগজাক্ট ফিগারটা দেখে বলতে হবে, কিন্তু পরিমান বেশি নয়, কিন্তু যেটা বললাম, খুব স্ট্রং পয়জন, ওরিজিনাল ফর্মেঅল্পেই ভালো কাজ করে দেবে বলে মিস্টার মাইতি একগাল হাসলেন
কানাই-এর মুখচোখ দেখে সৌভিক বুঝলো ইঁদুর মারার বিষ ভুল করে , নিছক ভুল করে নিহতদের পাতে চলে আসবে,এই যুক্তি কানাই মেনে নেবেন না সে মি মাইতিকে বললো- আর পেট ওপেন করে দেখা হয়েছে, বললেন না! সেখানে কি কি অবজেক্ট পাওয়া গেছে?
মি মাইতি বললেন- নরমাল খাবার দাবারএসব কেসে যা হয় আর কি, তবে ছেলেদুটির বোধহয় অম্লাশয়ের ধাত ছিল বিকেলের থেকে ফাস্টিং এ ছিল, পেট থেকে যা স্যাম্পেল পাওয়া গেছে তাতে ডাল ভাত মাছ তো আছে আর কোন একটা সবজিপ্যাথলজিস্ট সন্দেহ করছেন ফুলকপি
কানাই আঁতকে উঠলেন-ফুলকপি, এই গরমকালে, ফুলকপি কোথাথেকে আসবে!
- সেটা আমি জানি না মশায়, ওটা এগ্রিকালচারের কেউ আমার থেকে বেটার বলতে পারবে রিপোর্ট বলছে ফাইবারাস সাবস্ট্যান্স আছে আর প্যাথোলজিস্ট খালি চোখেও ফুলকপির টুকরো দেখেছেন
কানাই বললেন- আমাকে জেরায় কর্মচারিরা জানিয়েছে, মাছ ভাত ডাল আর আলুভাজা ব্যাস, কোন সবজির কথাই বলেনি কিন্তু আলুকে যদিনা সবজির মধ্যে ধরা যায়
কানাই এর কথায় মাইতিই সায় দিয়ে বললেন-ভিক্টিমদের খাবারের স্যাম্পেল থালা থেকে তুলে কেমিকাল ল্যাবে কাছে পাঠিয়েছিল সেখানেও ফুলকপির কিছু নেই, আপনি যা বললেন তাই আছে
কানাই খানিক নিশ্চিন্ত হয়ে বললো-একটা বড় ক্লু পাওয়া গেল তাহলে, যদিও সেটা একটা বড় ফুলকপি
সৌভিক হাসলো, বললো-মেনুবোর্ডেও কিন্তু কোথাও ফুলকপি লেখা নেই, ফুলকপি পকোড়া বা ডালনা, কিছুই নেই আর এই বৈশাখ মাসে ফুলকপি আসবেটাই বা কোথা থেকে!
কানাই এর মনে পড়লো, গত রাতে ফরেন্সিকের ছেলেটি ভিক্টিমদের থালা বাসন সিজ করে নিয়ে গেছিল কানাই মি মাইতির কাছে জানতে চাইলেন- স্যাম্পেলে ফুলকপি নাও থাকতে পারে কিন্তু ওদের থালায়, মাখা ভাতে কি ফুলকপি ছিল?
-সেটা তো জানি না, আমাদের কাছে স্যাম্পেল এসেছে শুধু
-কিন্তু থালা-বাটি শুদ্ধ সিজ করা হয়েছিল তো কালকে
মিস্টার মাইতি হতাশ গলায় বললেন-আসলে কাল রাতের ছেলেটি নতুন সে ভেবেছে বিষ মাখা ভাত এর একটা সেফ ডিসপোজাল করে দিলেই হলো তাই স্যাম্পেল কালেক্ট করে বাকিটা অটোক্লেভে পুড়িয়ে দিয়েছে
কানাই হতাশা প্রকাশ করার আর ভাষা খুঁজে পেলেন না, সৌভিক বললো- কাউকে যদি ধরা না যায়, মায়ের দিব্যি আমি ওই ইন্টার্নকেই গারদে পুরবো
মি মাইতি পরিস্থিতি সামলাতে বললেন-একটা ইনফরমেশান দিতে পারি চারটে বাটি থেকে সব মিলিয়ে স্যাম্পল নেওয়া হয়েছিল, সেখানেও কিন্তু বিষ নেই ফলে বলাই যায়, হাই চান্স আছে যে ফুলকপির থেকেই পয়জন ট্রান্সমিট করেছে কিন্তু যেহেতু ফুলকপির আর স্যাম্পেল নেই, আমরা খুব জোর দিয়ে সেটা বলতে পারবো না পেটের সাবসটান্সে সব কিছুতেই বিষ এর ট্রেস আছে

কানাই মিস্টার মাইতি এর যুক্তি বুঝতে পারলেন, কিন্তু ফুলকপির উৎস আন্দাজ করতে না পেরে সৌভিকের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন
সাব ইন্সপেক্টর ভুঁইঞা পাশে দাঁড়িয়ে কানাইদের সঙ্গে মিঃ মাইতির কথোপকথন শুনছিল সে বললো-স্যার, একবার এই সাসপেক্টদের ফুলকপির ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করলে হয় না!


গরমকালের ফুলকপি

কানাই এর মনে হল অনেক সময় সহজতম সমাধানটি চোখের সামনে থাকলেও দেখা যায় না স্কুলে থাকতে দেখতেন, স্কুলের মাস্টারমশায়রা ব্ল্যাকবোর্ডে আঁক কষতে কষতে খেই হারিয়ে ফেলেনআর তারপর বোর্ড থেকে দূরে গিয়ে গোটা বোর্ডখানিতে নিজেই কি লিখেছেন বোঝার চেষ্টা করেন
সাব-ইন্সপেক্টর ভুঁইঞা ফুলকপির কথা জিজ্ঞেস করামাত্র সার্ভার নরেন উৎসাহের সঙ্গে উত্তর দিল-কাল তো স্পেশালে ফুলকপি ছিল!
মেনুর ব্যাপারে নরেনই সবচেয়ে ভালো জানে, তারই কাজ কাস্টমারদের থেকে অর্ডার নেওয়া ভুঁইঞা যদিও স্পেশালের উদ্দেশ্য বুঝতে পারল না মনোহর খোলসা করে বললো- স্যার , রোজই একটা দুটো আইটেম স্পেশাল রান্না করা হয় যেমন বাজারে মরসুমী সব্জি আর মাছ পাওয়া যায় আর কি! অল্প পরিমাণে করা হয় শুধু মাত্র রেগুলার কাস্টমারদের জন্য কাল রাতে ফুলকপির ডালনা হয়েছিল
-বোর্ডে ফুলকপির কথা লেখা নেই কেন? সৌভিক জিজ্ঞেস করলো
-বোর্ডে থাকে না, র‍্যাকের বালতিতে স্পেশাল রাখিনা অল্প করে রাঁধা হয় তো রেগুলার কাস্টমাররা নরেনকে জিজ্ঞেস করে নেয় ডেইলি কি স্পেশাল তারপর কেউ স্পেশাল চাইলে নরেন রান্নাঘর থেকে স্পেশাল এনে রেগুলার কাস্টমারদের দেয়
কানাই বুঝতে পারলেন বালতির স্যাম্পেলে ফুলকপি ডালনা কেন পাওয়া যায়নি আর রহস্যের ধরন দেখে এটাও বুঝতে পারছেন, গতরাতের দুই হতভাগ্য অন্তত ফুলকপির ডালনা অর্ডার করেনি
সৌভিক তবু একবার নিশ্চিত হওয়ার জন্য নরেনকে জিজ্ঞেস করলো নরেন বললো- না , কালকের দাদাবাবুরা তো স্পেশাল নেয়নি
কানাই দিনের সেরা ক্লুটা পেয়ে গেছেন ফুলকপি অর্ডার হয়েছিল কি না তার থেকে বড় প্রশ্ন ফুলকপি এল কি করে এই গরমের দিনে কানাই শ্যামকান্তের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন- এই গরমে ফুলকপি কোথায় পেলে?
শ্যামকান্ত উত্তর দেওয়ার আগেই মনোহর বললো-স্যার বাবার ভিমরতি গত কাল সকালে দেখে গলি দিয়ে এক ঠেলাওলা যাচ্ছে, তার ভ্যানে এক গাড়ি ফুলকপিআমি বললাম, বাবা নিও না, নিও না, কবেকার বাসি শীতের ফুলকপি, ও নিয়ে আর কি হবেদর চাইলে, গোটা গাড়ি তিরিশ টাকা! একটা ফুলকপি গড়ে পঞ্চাশ পয়সাও পড়বে না এই শুনে বাবা আর লোভ সামলাতে পারলো না অর্ধেক গাড়ি ফুলকপি কিনে বসলো বলে, ফেলে ছুড়ে যদি দশটা ফুলকপিও ভাল বেরোও তবেও লাভ কাস্টমার ধরে রাখার জন্য স্যার কোন অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না সার, মাইরি
-       সেই ফুলকপির ডালনা আছে এখনও? সৌভিক জিজ্ঞেস করলো
-       রান্নাঘরে দেখুন, থাকবে, ভাঁড়ারঘরেও কাঁচা ফুলকপি কয়েক পিস আছে রান্নাঘরের এখন কি কন্ডিশান তো জানিনে
কানাই আবার তার দলবলকে হোটেলের কর্মচারিদের থেকে দূরে ডেকে নিলেন
ক্রাইম সিনে তার যা দেখাশুনার ছিল তা হয়ে গেছে এবার নির্দেশগুলো দিয়ে কানাই নিজে লাঞ্চের জন্য ডেকার্স লেনে যাবে, বহুদিনের অভ্যাস, দুপুরে ভাত খান না
প্রথমে পালা সাব-ইন্সপেক্টর ভুঁইঞার কানাই তাকে নির্দেশ দিলেন- প্রথমেই খুঁজে বের করো কোন ফেরিওয়ালা ফুলকপি বেচতে এসেছিল তাকে থানায় তুলে আনবে সে যদি আর অন্য কোন পাইস হোটেলে ফুলকপি বিক্রি করে থাকে সেটাও জানা দরকার সোর্স লাগিয়ে দেখো, জগমোহিনীর সঙ্গে এই লোকালিটির অন্যান্য পাইস হোটেলগুলোর সম্পর্ক কেমন! ব্যবসায়িক কারণে কি শত্রুতা আছেআর অবশ্যই সিভিল ড্রেসের স্টাফদের নিয়ে একটা সার্চ চালাও বেশিদূর যেতে হবে না, এক কিলোমিটারের মধ্যে সার্চ চালাও, যতটা হয়, জানি ম্যান পাওয়ার কম! অন্তত রাস্তার পাশের ভ্যাট, ড্রেন, কেউ বিষের প্যাকেট বা পাউচ ফেলে গেছে কিনা বিশেষ ভাবে দেখবে! তোমার বানানো ইনিশিয়াল রিপোর্টগুলো সৌভিককে দিয়ে যাও লালবাজারের তরফে সৌভিকই তোমার সঙ্গে যোগাযোগে থাকবে, প্রয়োজন পড়লে আমিও যোগাযোগ করতে পারি
ভুঁইঞা নিজের ব্যাগ থেকে রিপোর্ট বের করে সৌভিকের হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-আর এই সাসপেক্টদের কি করবো সার? ছেড়ে দেব?
-পাগল হয়েছিল, নেগলিজেন্সি, বা ১৪৪ এর কিছু একটা কেস মেরে তিন চার দিন ভিতরে রাখার ব্যবস্থা করো আর মৃত দুজন, সহদেব আর রজনীকান্ত যে বোর্ডিং এ থাকতো, কি যেন নাম-নিউ এজ, হ্যাঁ নিউ এজ এর দু তিনটে বোর্ডার আর মালিকদের ক্লোজ ওয়াচে রাখো কানাই বললেন
ভুঁইঞা সেলাম ঢুকে শ্যামকান্তদের নিয়ে চলে গেল
কানাই ফরেন্সিকের ফটোগ্রাফার শিবুকে ডাকলেনকাল রাতেই যদি তুই থাকতিস শিবু, খুব ভুল হয়ে গেছে
-কাল দাদা হুগলির দিকে একটা ইন্সিডেন্টে গেছিলাম শিবু বললো
কানাই জিজ্ঞেস করলেন- কি ক্যামেরা এনেছিস, ম্যানুয়াল না ডিজিটাল?
-দুটোই আছে, যেটা বলবেন, ৩৫ মিমির ম্যানুয়াল এনেছি, কিন্তু ম্যানুয়ালের ছবি ওয়াশ করতে দুদিন লাগবে দাদা, স্টুডিওতে চাপ চলছে
-আমি বাপু তোদের ওই কম্পিউটারের ধান্দায় নেই ডিজিটাল জুমে আমার লাভ নেই তুই বরং ৩৫ দিয়ে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল কিছু তুলিস, যেন হোটেলের খাওয়ার ঘরটা পুরো দেখা যায় আর নাহয় ডিজিটালে কয়েকটা টেবিলের ক্লোজ তুলিস
শিবু ফটো তুলতে হোটেলের ভিতর চলে গেল রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে কানাইচরণ, সৌভিক আর ফরেন্সিক এক্সপার্ট মি মাইতি
মি মাইতির দিকে তাকিয়ে কানাই হেসে ফেললেন- জানি দাদা, আপনাকে যত কাজ বলব, অত কাজ আপনার সেকশান করে উঠতে পারবে না তবু আমার কাজ বলে রাখি সৌভিক ড্রেনে, রাস্তায়, বেঞ্চে রেড মার্কার ফেলে রেখেছে সেগুলো একটু স্পেশালি দেখবেন, যদি কোন ব্লাড স্টেইন বা পয়জনের কোন ট্রেস পান আর অন্তত হোটেলের মালিক আর বাকি তিনজনের বডিপার্টসের একটা কেমিক্যাল এনালিসিস হলে ভালো হয়, যদি এদের মধ্যে কেউ কোনভাবে বিষ বহন করে থাকে-সেইটে বোঝা যাবে নিউ এজ বোর্ডিং এর বাকি বোর্ডারদের কেমিকাল টেস্টিং ও হওয়া দরকার, যদিও সেটা আপনাদের সময়ে কুলবে আমি জানি না ফাইনালি, ফর কনফারমেশান, হোটেলের ঘরের একটা থার্মাল ইমেজার বা এ এল সি কিছু একটা হওয়া দরকারযাতে অন্তত ছেলেদুটো কোথায় খেতে বসেছিল, কোথায় মুখ থুবড়ে পড়লো সেটা কনফার্ম হওয়া যায়
কানাই এর আদেশ বা অনুরোধ শুনে মি মাইতিও নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন
বাকি রইলো, সৌভিক; কিন্তু কানাই আর তাকে কোন নির্দেশ দিলেন না দুপুর গড়াতে চললো সৌভিকের পিঠ আলতো করে চাপড়ে কানাই বললেন-চল, আর এখানে থেকে কিছু করার নেই ডেকার্স লেনে গিয়ে লাঞ্চ টা সেরে ফেলা যাক
কানাইদের টয়োটা কোয়ালিস ছুটলো ডেকার্স লেনের দিকে


অলংকরণঃ লেখক 

আবার লালবাজার

ডেকার্সে কোনরকমে ডিম চাউমিন খেয়ে কানাইদের তাড়াতাড়ি লালবাজার ফিরতে হলো জয়েন্ট সিপি ডেকে পাঠিয়েছেন কেস ফাইলগুলো নিজের চেম্বারে রেখেই কানাই ফের ছুটলেন জয়েন্ট সিপিকে সংক্ষেপে কেসের অগ্রগতি বুঝিয়ে আসতে আজকে বিকেলের প্রেস কনফারেন্সে কেসটার ব্যাপারে প্রেসকে সিলেক্টিভ ব্রিফ করা হবে কমিশনার নিজে প্রেসের সঙ্গে কথা বলবেন তাই গুরুত্ব আলাদা, যদিও প্রেস নিজেরাই ইতিমধ্যে অনেকটা খবর পেয়ে গেছে কানাই জয়েন্ট সিপিকে বলে এলেন, আপাতত যেন প্রেসকে এই জানানো হয় যে ঘটনায় হোটেলের মালিক, ম্যানেজার ও দুই কর্মচারিকে আটক করা হয়েছে
নিজের চেম্বারে ফিরে এসে কানাই একটি অতি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন
সৌভিক নেভিকাট এর প্যাকেট এগিয়ে ধরে বললো- সাসপেনশানেই আরামে ছিলেন কিনা?
কানাই আরেকবার সশব্দে নিঃশ্বাস ত্যাগ করে প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট তুলে নিল সৌভিক আগুন ধরলো
-       কে খুনি কিছু বুঝতে পারছেন?
কানাই একটি ধোঁয়া ছেড়ে বললেন- এই কেসটা ফিলজফিক্যালিকে খুনিএর কেস না এখনও কেসটা কিভাবে খুনটা হলো সেই জায়গাটায় এসে আটকে আছে
-খুনিকে একবার ধরতে পারলেই চাবকে কি করে ক্রাইম করলো বের করা যাবে
কানাই এই কথায় পাত্তা না দিয়ে বললেন- অপরাধের সমাধান করা আসলে একটা রাস্তা খুঁজে পাওয়া আর এক পথিকের মুখ দেখার মত সূত্রের জঙ্গলের মধ্যে কোথাও একটা রাস্তা আছে, একটা রাস্তা চলে গেছে কোন ভয়ঙ্কর ক্রাইমের দিকেএই রাস্তার শেষটা কিন্তু আমি আমরা জানি শেষটা অবশ্যই হবে কোন ভয়ঙ্কর ঘটনা, খুন, চুরি, এই কেসে যেমন ডবল হোমিসাইড আমরা যেটা জানি না সেটা হল রাস্তাটা কি আর সেই রাস্তায় কে বা কারা হাঁটলো!
-অনেক কেসে রাস্তাটা পরিষ্কার চেনা যায় সূত্রের জঙ্গলে পথ হারাতে হয় না যেমন এই কিছুদিন আগে খবরে পড়লাম, কোন একটি আপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের সোসাইটির চেয়ারম্যানকে চাপাতি দিয়ে মাথায় মেরে সেপটিক ট্যাঙ্কে ফেলে দিয়ে গেছে এখানে পুলিশের কাছে রাস্তাটা পরিষ্কার কেউ বা কারা চেয়ারম্যানের মাথায় আঘাত করেছে, তারপর টানতে টানতে সেপটিক ট্যাঙ্ক অবধি নিয়ে গেছে সিঁড়ি দিয়ে যদি নিয়ে যায় তাহলে এ এল সি পেনের আলো মারলেই ব্লাড স্টেইন স্পষ্ট হয়ে যাবে আর ফাইনালি সেপ্টিক ট্যাঙ্কে ফেলে দিয়েছে অল ক্লিয়ার কিন্তু কে করেছে সেইটা আমরা শুধু জানি না অর্থাৎ এই পথে হাঁটার সম্ভাবনা কার আছে! তখনই আমাদের মোটিভ, আলিবাই, পারিপার্শ্বিক প্রমাণ খতিয়ে দেখতে হয়
-আবার অনেক কেসে খুনির একটা অবয়ব বোঝা যায় পেপারে দেখছিলাম লেক মার্কেট এরিয়ায় ভোরবেলা একটা বডি পাওয়া গেছেলোকাল পুলিশ গিয়েই বডিটা চিনতে পেরেছে, একটা তোলাবাজকে কেউ বা কারা খুন করে ফেলে দিয়ে গেছে আশেপাশে কোন অস্ত্র বা ব্লাড স্টেইন নেই তাই কি করে খুন করলো, ফরেন্সিক পোস্ট মর্টেম না হলে বলা মুশকিল কিন্তু কে বা কারা এই তোলাবাজকে খুন করতে পারে, যাকে খুনির অবয়ব বললাম, তা লোকাল পুলিশও বুঝতে পারছেসে জন্যে গোয়েন্দা বিভাগের প্রয়োজন নেই এই কেসে তোলাবাজের কিছু প্রতিপক্ষকে ধরে জেলে পুরে বেশ বাটাম দিলেই খুনের পদ্ধতিটা জানা যাবে
কানাই থামলেন সৌভিক জানে দুপুরে খাওয়ার পর প্রথম সিগারেট ধরালে কানাই দার্শনিক হয়ে পড়ে, আর যেহেতু গোয়েন্দাই, কানাই এর দর্শনের কথাও আসলে ক্রিমিনলজির টেক্সটবুক!
সৌভিক বললো- আমাদের কেসে রাস্তা আর সেই রাস্তায় কে হাঁটলো দুটোই ধোঁয়াশায়
-এটাই একটা ভালো রহস্য এর প্রাথমিক গুণকানাই বললেন- সহদেব আর রজনীকান্তকে কি করে বিষ দেওয়া হল, সেটাও আমরা বুঝতে পারছি না আর কে বিষ দিল-সেটাও আমাদের আন্দাজে নেই অর্থাৎ আমরা কিছু অভিযুক্ত ধরেছি ঠিকই কিন্তু কোন মোটিভ বুঝে উঠতে পারছি না খুনির কোন অবয়বও আমরা দেখতে পাচ্ছি না সাক্ষ্যপ্রমাণ, পারিপার্শ্বিক প্রমানও এমন কিছু নেই যেখান থেকে আমরা রাস্তাটার একটা আন্দাজ করতে পারি আবার মৃত ছেলেদুটিও এতটাই সাধারন যে তাদের হত্যা করার কোন সহজবোধ্য কারণ আমাদের চোখে পড়ছে না এইবার এই কথাটাকেই ঘুরিয়ে দেখা যাক, ছেলেদুটি এতই সাধারন, যে তাদের খুন করার কোন কারণ নেই, তবুও তাদেরকে খুন হতে হল আর আমরা আমাদের পুলিশে কাজ করার সূত্রে, আই মিন, আমাদের অপরাধবিজ্ঞান থেকে কি জানি?
সৌভিক বললো-সাধারন মানুষকে খুন হতে হয় যদি তারা ক্রিমিনালদের কোন বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে অনিচ্ছাকৃত খুন হলে অথবা কোন দুর্ঘটনাতেও সাধারন মানুষের প্রাণ যায় আর এবাদে একটা কারণ অবশ্যই...
সৌভিকের কথার খেই ধরে কানাই বললেন-সিরিয়াল কিলার আপাতভাবে কাকে খুন করবে সেটা সিরিয়াল কিলারদের কাছে বিষয় নয় কোন গোষ্ঠীর মানুষকে খুন করবে সেটা বিবেচ্য হলেও হতে পারেস্টোনম্যান যেমন ফুটবাসীদের মেরেছে শুধু
সৌভি্ক সিগারেটে টান দিতে ভুলে গেল
-স্টোনম্যানই লালবাজারের শেষ সিরিয়াল কিলার নয় এরপরেও লালবাজারে মাল্টিপল সিরিয়াল কিলিং এর কেস এসেছে সেই সিরিয়াল কিলাররা যদিও সুপারি কিলার, যারা টাকা নিয়ে একাধিক খুন করে থাকে, এদের খুনের নির্দিষ্ট মোটিভ থাকে স্টোনম্যানের ঘটনায় শিক্ষা নিয়ে লালবাজার তাই সিরিয়াল কিলিং এর কথা প্রেসে বলেনা
সৌভিক কানাই এর কাছে জানতে চাইলো-সিপি সাহেবকে বলেছেন?
-বলেছি, একটা পসিবল কারণ হিসেবে, কারণ আমি বাকি সম্ভাবনাগুলোকেও উড়িয়ে দিচ্ছি নাজয়েন্ট সিপির নিজের মাথাতেও সেটা ছিল, তাই মিডিয়াকে পুরো খবর দেওয়া হয়নি কোলকাতায় পাইস হোটেলে সিরিয়াল কিলার জানতে পারলে বুঝতে পারছিস, মিডিয়ার রেড লেটার ডে হয়ে যাবে পানওয়ালার সামনে বুম ধরে জিজ্ঞেস করবে সিরিয়াল কিলাকে চেনে কিনা! হতেও তো পারে ছেলেদুটি কোন অশুভ চক্রে জড়িয়ে পড়েছিল বা এমন কোনো কিছু জেনে ফেলেছিল যা ওদের জানার কথা নয় সে কারণে দক্ষ সুপারি কিলারের হাতে খুন হতে হল দক্ষ সুপারি কিলারের কাজ হলে সে সূত্র রাখবে না
সৌভিক জিজ্ঞেস করলো- আমি কি এই শেষ সম্ভাবনাটা খতিয়ে দেখবো?
-এগজাকটলি, এখন সেটাই তোর কাজ সাব-ইন্সপেক্টরটার সঙ্গে যোগাযোগ রাখ ফরেন্সিকের রিপোর্টগুলো বিকেলের মধ্যে এলে আমাকে জানাস আর ছেলেদুটোর বোর্ডিং হাউসের আশেপাশে তোর খোঁচরদের ফিট কর এরা কেমন ছেলে ছিল, বোর্ডিং এর বাকিদের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল বোর্ডিং এ কোন নেশার লুপ আছে কিনা, কলেজে এদের বন্ধুবান্ধব কারাকাউকে সন্দেহ হলে তার পিছনে খোঁচড় লাগিয়ে দিবি আর আরেকটা জিনিসও তোকে করতে হবে সন্ধে থেকে এই ছেলেদুটি কোথায় ছিল আমি জানতে চাই, বোর্ডিং আর জগমোহিনী ছাড়া আর কোন জায়গায় গিয়েছিল কিনা, বিকেলে কি কিছু খেয়েছিল  অটোপসির রিপোর্ট বলেছে অম্বলের ধাত আছে ছেলেগুলোরএই দিকটাও তোকেই দেখতে হবে
সৌভিক মোবাইলে নোট করে নিলো
আর সিরিয়াল কিলার হলে?
-তাহলে পরের ইন্সিডেন্টের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া সব চেষ্টা ভোগে যাবে বলে কানাই সাব ইন্সপেক্টর ভুঁইঞার রিপোর্টে চোখ রাখলেন
সৌভিক চেম্বার ত্যাগ করলো কানাই ভাবলেন আজ বিকেলের স্বাস্থ্যপান আর হল না

নীলুদার হোটেল

জগমোহিনীর ভোজনালয়ের কেসটা কানাই এর হাতে আসার পর তিন দিন কেটে গেছে নতুন কোন ঘটনার খবর কানাই এর কানে আসেনি তদন্তেও বিশেষ কোন অগ্রগতি নেই জগমোহিনী ভোজনালয়ের ফরেন্সিক রিপোর্ট মি মাইতি পাঠিয়েছেন রাস্তায়, ড্রেনে আর কাঠের বেঞ্চে পরীক্ষামূলক ভাবে আলো ফেলে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি যদিও গোটা রাস্তা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি, সময় ও লোকবলের অভাবে রাস্তার নির্বাচিত অংশেই শুধু পরীক্ষার করা হয়েছিল মি মাইতি রান্নাঘর থেকে ফুলকপির বালতি খুঁজে পেয়েছিলেন সেই স্যাম্পেলে বিষ নেই থাকার কথাও নয় কারণ সেখানে বিষ থাকলে ক্যাজুয়ালটি আরো বেশিই হত যে চেয়ার-টেবিলে ছেলেদুটি বসেছিল সেখানে থার্মোগ্রাফ করা হয় কিন্তু ঘটনার পর অনেক সময় পেরিয়ে যাওয়ায় থার্মোগ্রাফ কিছু বুঝতে পারছে না, যেমন অন্যান্য চেয়ারগুলি সম্পর্কেও থার্মোগ্রাফ নিশ্চিত ভাবে বলতে পারছে না হোটেলের চার কর্মচারির হাতের ও শরীরের অন্যান্য অংশ থেকে স্যাম্পেল নিয়ে কেমিক্যাল এনালিসিস করা হয়েছিলকিছু পাওয়া যায়নি
সাব-ইন্সপেক্টর ভুঁইঞার সঙ্গে বিগত তিনদিন সৌভিক কোঅরডিনেট করেছে ভুঁইঞা নিউ এজ বোর্ডিং এ মৃতদের বন্ধুদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছে আর সৌভিক ওদের পিছনে খোঁচর লাগিয়ে রেখেছিল ছেলেগুলি চা সিগারেটের নেশা করে কোন ব্যক্তিগত শত্রুতার কোণ বোঝা যায়নি ভুঁইঞা তার দলবলকে নিয়ে পেরিমিটার সার্চও করেছিল, সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি যদিও যে বিষ দেওয়া হয়েছে, এলুমিনিয়াম ফসফাইড, তা মোটেই পাওয়া দুষ্কর নয় সামনেই বড় বাজার, যেখানে খোঁজ করলে অন্তত পঞ্চাশটি দোকানে রাইস ট্যাবলেট পাওয়া যেতে পারেযে ঠেলাগাড়ির চালক ফুলকপি বিক্রি করেছিল, তাকে ভুঁইঞা খুঁজে বের করেছিল, জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয় আরো দুটি হোটেল ঠেলার ফুলকপি কিনেছিলে তাদের উপর নজর রাখা হচ্ছে
এই যেখানে গোয়েন্দাদের তদন্তের অগ্রগতি সেখানে মিডিয়া লাফিয়ে লাফিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে সরাসরি কিছু না বললেও ঠারেঠোরে মিডিয়া কভারেজ বুঝিয়ে দিচ্ছে যে বিষয় গুরুতর ও লোকজনের হোটেল রেস্টুরেন্টে খাওয়ার সময় সাবধান থাকা উচিত সিলেক্টিভ লিক দিতে গিয়ে এই হয়েছে মুশকিল সিলেকটিভ লিক দেখে মিডিয়া আরোই বুঝে ফেলে যে লালবাজার চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে, জয়েন্ট সিপি নিজে উদ্যোগ নিয়ে জগমোহিনীর মালিক শ্যামকান্ত, মনোহর আর দুই কর্মচারির বিরুদ্ধেই আপাতত অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুর কেস দিতে বলেছেন তাতে কানাইচরণের একদিকে ভালোই হয়েছে, অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুর কেস থাকার ফলে আপাতত ওই চারজন জামিন পাচ্ছে না,পুলিশ হেফাজতে রাখা হবে প্রয়োজন পড়লে কানাই ডেকে জেরা করতে পারবেন
এই যখন অবস্থা তখন কানাই আরো ঝুঁকে পড়ছেন সিরিয়াল কিলার তত্ত্বের দিকে সূত্রগুলো যদিও আধভাঙা, তাই অপেক্ষা করছেন যদি সিরিয়াল কিলারই হয় তবে তার পরের শিকারের জন্য প্রথম ঘটনায় ফরেন্সিক আর পুলিশের দিক থেকে আর দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে বেশ কয়েকটা বড় ভুল থেকে গেছে জয়েন্ট সিপি ক্রাইম এর চেম্বারে গিয়ে কানাই নিজে বলেকয়ে রাজি করিয়েছেন, একজন ফরেন্সিক এক্সপার্ট যেন অন্তত রাত বারোটা অবধি লালবাজারে থাকেজয়েন্ট সিপি ক্রাইম এক সপ্তাহের জন্য এই ব্যবস্থা করতে রাজি হয়েছেন এই শর্তে যে এর মধ্যেই কানাই রহস্যের সমাধান করবেনকানাই আর সৌভিকও গভীর রাত অবধি নিজেদের চেম্বারেই থাকছেন কন্ট্রোল রুমকেও বলা আছে, বিষ প্রয়োগ আর হোটেল সংক্রান্ত কোন কেস এলেই যেন কানাইচরণকে এত্তেলা দেওয়া হয়

কন্ট্রোল রুম থেকে কাঙ্খিত ফোনকলটি পাওয়া মাত্র কানাই সৌভিককে ঝাড়া দিলেন, সৌভিক মোগলাই পরোটা খেয়ে উঠে টেবিলের উপরেই তন্দ্রা দিচ্ছিলঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁয়েছে কন্ট্রোলরুমে খবর এসেছে দশটা পঞ্চাশে, রাত সাড়ে দশটার ঘটনাকানাই কন্ট্রোল রুমকে নির্দেশ দিয়েছেন আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার সাব-ইন্সপেক্টর ভুঁইঞাকে এখনই ঘটনাস্থলে পাঠাতে ফরেন্সিক সেলেই মি মাইতিকে পাওয়া গেল, যদিও শিবু নেই, সে সি আই ডি এর একটা কেসের ব্যাপারে সাউথ ২৪ পরগণায় গেছে
সদলবলে কোয়ালিসে চেপে কানাইচরণ যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছলেন ঘড়ির কাঁটা তখন সাড়ে এগারোটায় পথে গাড়ির কাঁচ নামিয়ে কানাই তিনবার ট্রাফিককে খিস্তি করেছেন
কন্ট্রোলরুমের কাছে যেটুকু কানাই শুনেছিলেন, গাড়িতে আসার সময় কানাই মি মাইতি আর সৌভিককে সেটুকু জানিয়ে রাখলেন ফের পাইস হোটেলে একজনের মারা যাওয়ার খবর মিলেছে এইবারের হোটেলটির নাম নীলুদার হোটেল, আমহার্স্ট স্ট্রিট পোস্ট অফিসের কাছে হোটেলটি রাতের খাওয়াদাওয়া চলছিল, হোটেলে বেশি লোক ছিল না এমন সময় সার্ভার লক্ষ্য করে যে একটি খাওয়ার টেবিলে একজন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে হোটেলের মালিক খবরের কাগজের সূত্রে জগমোহিনীর ঘটনাটা জানতো মালিক নিজেই লালবাজার কন্ট্রোল রুমের নাম্বারে ফোন করে জানায় কন্ট্রোল রুমই আমহার্স্ট স্ট্রিট থানাকে ইনফর্ম করে মৃতের নাম দেবোত্তম দাস, বয়েস চল্লিশ আন্দাজ, লোকাল মেসেই থাকে মালিকের মুখচেনা, আমাদের আগের কেসের মতই তবে এই কেসে ভিক্টিমের পেশাটা গোলমেলে হোটেলের মালিক নীলু গোঁসাই জানিয়েছে, দেবোত্তমকে সে চিট ফান্ডের এজেন্ট হিসেবে চিনত

আমহার্স্ট স্টিট থেকে একটি গলি, রামশরণ লাল স্ট্রিট, উত্তর দিকে ঢুকে গেছে স্ট্রিটের প্রথম হোটেলটিই নীলুদার হোটেল হোটেলের দুদিকে দেওয়াল আর বাকি দুদিক আমহার্স্ট স্ট্রিট আর রামশরণ লাল স্ট্রিটের দিকে উন্মুক্ত হোটেলে ঢুকবার জন্য আলাদা করে কোন দরজা নেই রাত্রে রাস্তার দিকের খোলা অংশগুলি বন্ধ করবার জন্য বিশাল কোলাপসিবলআঁটোসাঁটো রান্নাঘর ঠাটবাট দেখে মনে হয় জগমোহিনীর মত অত পসার নেই সাব-ইন্সপেক্টর ভুঁইঞা তলব পাওয়া মাত্র ফোর্স নিয়ে চলে এসেছে হোটেলটিকে ঘিরে ফেরা হয়েছে পেরিমিটার টিপ দিয়ে, ট্র্যাফিক ব্যারিকেড দিয়ে ভিড় সামলানোর ব্যবস্থা হচ্ছে মিডিয়ার কাছে নির্ঘাত খবর চলেই গেছে, আর না গেলেও আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে যাবে রাস্তার উপর তখন ট্রাফিক সামলানো এক ঝক্কি হবে
আমহার্স্ট স্ট্রিটের উপর গাড়ি রেখে কানাইচরণ নীলুদার হোটেলের সামনে চলে এলেনসেখানে তখন ভুঁইঞা হোটেলের কর্মচারিদের ধমক ধামক দিয়ে জেরা করছে কানাইকে দেখে সেলাম ঢুকলো কানাই জিজ্ঞেস করলেন-মালিক কোন জন?
একজন মাঝবয়সী,টাকমাথা আর ধুতিপরা লোক উত্তর করলো -আজ্ঞে, আমি সার, নীলু গোঁসাই
ভুঁইঞা উদ্যোগ নিয়ে বাকি কর্মচারিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল রান্নাঘরে বটঠাকুর বাদে আর এক মশালচি আলাদা করে কোন সুপারভাইজার নেই সার্ভার কাম ম্যানেজার কাম সুপারভাইজার একটি বছর আঠারোর ছেলে, নাম সোম বিশ্বাস গুটখা খেয়ে তার দাঁতে কালো ছোপ পড়ে গেছে চুল ব্যাকপ্রেস করা, তেলে চকচক করছে
কানাই জিজ্ঞেস করলেন-টেবিলে আর কেউ ছিল?
-না সার, একাই খাচ্ছিলেন সোম বিশ্বাস উত্তর দিল
-আর হোটেল তখন কত জন ছিল?
-তা হবে সাত আট জন লাস্ট ব্যাচ খাচ্ছিল সার সোম জানালো
পাশ থেকে ভুঁইঞা বললো-এবার সবাইকে আটকে রেখেছি স্যার
কানাই মাথা নাড়লেন সোমকে কানাই ফের জিজ্ঞেস করলেন- কি অর্ডার করেছিল?
-ডাল ভাত আর সবজি, সয়াবিন
কানাই জিজ্ঞেস করলেন-ফুলকপি অর্ডার করেনি?
সোম উত্তর দেবার আগে পাশ থেকে মালিক নীলু গোঁসাই অবাক হয়ে বললো-এই গরমের দিনে ফুলকপি তো হয় না সার
কানাই আর কথা বাড়ালেন না খাওয়ার জায়গার দিকে এগিয়ে এলেন ফুটপাথ থেকে দু-ফুট উপরে হোটেলের খাওয়ার জায়গা ছোট সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয় সৌভিক এখানে-ওখানে রেড মার্ক ফেলছিল আর মি মাইতি আগে থাকতেই খাওয়ার ঘরে উঠে একটি টেবিলের উপর ফরেন্সিক কিট খুলতে ব্যস্ত
কানাইকে দেখে বললেন-প্রথমেই একটা থার্মোগ্রাফ করা দরকারআগের বার অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ায় কোন কাজের কাজ হয়নি
ফরেন্সিক কিট থেকে যে বস্তুটি মি মাইতি তুলে নিলেন সেটা দেখতে একটি রিভলভারের মত, শুধু রিভলভারের নলটি যা নেই নলের জায়গায় একটি মনিটর মনিটর এর সঙ্গে হাতল লাগানো সন্দেহজনক বস্তুর উপর তাক করলে মনিটরে থার্মাল ইমেজ ফুটে ওঠেস্বাভাবিক তাপমাত্রার সঙ্গে সন্দেহজনক বস্তুটির কোন অংশের তাপমাত্রার পার্থক্য থাকলে মনিটরে ধরা পড়ে মি মাইতি আর কানাই দেওয়াল সংলগ্ন একটি টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন সেখানে তখনও দেবোত্তম দাসের বডি পড়ে আছে
নীলুদার হোটেলের টেবিলগুলি আকারে ছোট, খাওয়ার ঘরের পরিধিও জগমোহিনীর তুলনায় অর্ধেক, প্রতিটি টেবিলের সঙ্গে দুটি মুখোমুখি চেয়ার মি মাইতি তার থার্মাল ইমেজার প্রথমে তাক করলেন ঘরের অন্যান্য চেয়ারগুলির দিকে কানাই মনিটরের দিকে তাকালো নীল রঙের মনিটর, চেয়ার টেবিল ঘরের দেওয়াল সেখানে সব কিছু নীল হয়ে দেখা যাচ্ছে থার্মোগ্রাফ মানুষের শরীরের উষ্ণতা বুঝতে পারলে অথবা অন্য কোন উষ্ণতর বস্তু, মনিটরের নীল রঙ হলুদ থেকে লাল হতে থাকে মি মাইতি যখন অন্যান্য চেয়ার গুলিতে থার্মাল ইমেজার তাগ করছিলেন, তখন অধিকাংশ চেয়ারই নীল রঙে দেখা গেলো, হাতেগোনা কয়েকটিতে হলুদ রঙ দেখালঅর্থাৎ সেখানে কেউ খেতে বসেছিল কানাই মনে মনে গুনে দেখলো হলুদরঙা চেয়ারের সংখ্যাটা নীলু গোঁসাই এর হিসেবের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, সাত আটজন খেতে বসেছিল
মি মাইতি তার যন্ত্র দেবত্তোম দাসের মুখোমুখি থাকা চেয়ারটির উপরে তাগ করলেন কানাই মনিটরে দেখলো-হলুদ রঙ
কানাই কিছু বলে উঠবার আগে মি মাইতি নিজে থেকেই বললেন- থার্মাল ইম্প্রেশান অনেকক্ষণ থেকে যায়, সন্ধের দিকেও যদি কেউ এই চেয়ারে বসে থাকে তার উষ্ণতা থার্মোগ্রাফে ধরা পড়তেই পারে
-কোন ভাবে কি বোঝা যায়, মৃতের সঙ্গে বা ঠিক আগে কেউ এই টেবিলে খাচ্ছিলো কিনা?
মি মাইতি সৌভিককে ডেকে বললেন মৃতদেহটিকে চেয়ার থেকে অল্প উঁচু করে ধরতে সৌভিক আদেশ পালন করলো, মি মাইতি দেবোত্তম দাসের চেয়ারে ইমেজার তাগ করলেন, মনিটর গাঢ় হলুদ হয়ে উঠলো মি মাইতি কানাইকে বললেন- হলুদের তীব্রতা দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে দুটি চেয়ারের হলুদই একই ইন্টেনসিটির, অর্থাৎ, দেবোত্তম দাস যখন খাচ্ছিলো- সে সময় বা তার অল্প আগে পরেই এই চেয়ারে কেউ বসেছিল
কানাই ভুঁইঞাকে হাঁক দিয়ে হোটেলের সার্ভার সোমকে ফের নিয়ে আসতে বললেন ভুঁইঞা সন্দেহভাজনদের রামশরণ লাল স্ট্রিটের একধারে সার দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল সোমের কলার ধরে হোটেলের খাওয়ার জায়গায় নিয়ে এল সোমকে দেখে মনে হল যে সে দ্বিতীয়বার তলব হওয়ায় বেশ ভয় পেয়েছে, দুই হাত বুকের কাছে জড়ো হয়ে আছে
-এই টেবিলে আর কেউ ছিল না, তুই সিওর? কানাই জিজ্ঞেস করলেন
সোম ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল-হ্যাঁ সার উনি একাই খাচ্ছিলেন রোজই একাই খান
কানাই এর সামনে দিয়ে একটা বিরাশি সিক্কার চড় উড়ে এল ভুঁইঞা পাথরের মত শক্ত হাত গিয়ে পড়লো সোমের গালে সোমের শরীর ছিটকে গিয়ে পড়লো একটি টেবিলের পায়ায় ভুঁইঞা আরো মারতে যাচ্ছিল, কানাই বাধা দিলেনআমি এই ভাবে কেস সলভ করি না ভুঁইঞা ভুঁইঞা সামলে নিল
কানাই হাঁটু গেড়ে সোমের সামনে বসলেন কপালের কোণ দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে কানাই নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে রক্ত মুছে দিয়ে সোমকে আবার জিজ্ঞেস করলেন- এই লোকটা খেতে বসার আগে এই টেবিলে কে বসেছিল?
সোম কেঁদে ফেললোসার বিকেল থেকেই অনেক লোক বসছে সার ওর আগে একটা বাচ্চা ছেলে খাচ্ছিলো কিন্তু ওর সঙ্গে খায়নি সার এই লোকটা বসার আগেই ওই ছেলেটা উঠে গেছে
-কত আগে উঠে গেছে? ঠিক আগে? না খানিক আগে, কতক্ষন আগে?
সোম কি বলবে বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো
কানাই বুঝিয়ে বললেন-তুই যখন এই লোকটাকে খাবার দিতে এলি, তখনও আগের লোকের থালা বাসন টেবিলে আছে কি নেই?
সোম এইবার বুঝতে পারলো, বললো-হ্যাঁ ছিল, আমিই টেবিল পরিষ্কার করেছি
-আগের ছেলেটার ফেলে যাওয়া কতটা খাবার ছিল? কি কি অর্ডার করছিল, ভেবে উত্তর দে
সোমকে উত্তর দিতে ভাবতে হল না, সে বললো- বেশি খাবার বাঁচেনি সার, পাতের সাদা ভাত কিছু ছিল আর বাটির সব ফাঁকা ছিল সার ছেলেটা খাসির মাংস আর ডাল অর্ডার করেছিল
-কি ডাল?
-মুসুর ডাল, রেগুলার ডাল
কানাই অল্প হাসি হাসি মুখ করে সৌভিকের দিকে মুখ তুলে তাকালেন, সৌভিক নোট নিতে ব্যস্ত কানাই হাঁটু ঝেড়ে উঠে পড়লেন ভুঁইঞা এসে সোমকে টেনে তুললো
কানাই তার ডানহাতের দিকে একটি ফাঁকা টেবিলের সংলগ্ন চেয়ারে বসে সোমকে ডেকে নিলেন উল্টোদিকের চেয়ারে বসতে বললেন
-যা জিজ্ঞেস করবো ভালো করে ভেবে বলবি
সোম ঘাড় নাড়লো
-এই ধর আমি আগের ছেলেটা আমি এখন খাসির মাংস আর ডাল খাচ্ছি আমার খাওয়া শেষ এইবার পরের লোকটা এসে একই টেবিলে বসলো বলে কানাই সৌভিককে ডেকে উল্টোদিকের টেবিলে বসালেনএখন আমার পাতে খাবার আছে, কিন্তু ওর পাতে নেইওকে দেখা মাত্র আমি আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলাম বলে কানাই নিজে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে থাকলেন-এইবার টেবিলে একা ওই লোকটা বসে আছে তুই অর্ডার নিতে এসে দেখলি, লোকটা একা টেবিলে আর কেউ নেই, আগের লোকের ফেলে যাওয়া থালাবাটি এখনও কিন্তু টেবিলেকিন্তু তুই টেবিল এখনই পরিষ্কার করলি না, শুধু অর্ডার নিয়ে চলে গেলিতাইতো? কেন টেবিল পরিষ্কার করলি না?
সোম মাথা নেড়ে বললো-হাতে ন্যাতা নেই তো, তাই আগে খাবার এনে দিই, কাস্টমার খেতে শুরু করে তারপর, পুরানো কাস্টমারের থালা তুলে নিই
-গুড, তাহলে তুই লোকটার থেকে অর্ডার নিলি, রান্নাঘরে গিয়ে খাবার নিয়ে এলি সয়াবিন আর ডাল, মুসুর ডালই তো? হ্যা, তারপর খাবার রেখে আবার কুলুঙ্গি থেকে ন্যাতা এনে টেবিলের উল্টোদিকটা মুছে দিলি আর এঁটো নিয়ে চলে গেলি বল, এরকমই করেছিলি, ভেবে বল
সোম ঘাড় হেলালএরকমই করেছিলাম সার, সেম, সার, সেম
কানাই হেসে সোমের পিঠ থাবড়ে দিলেন -আগের ছেলেটার মুখ মনে আছে, আগে দেখেছিস?
-মাইরি বলচি সার, একদম মনে নেই, আগে কোনদিন দেখিনি, সার, নতুন কাস্টমার, বাচ্চা ছেলে কলেজের স্টুডেন্ট হবে
কানাই বললেন- ঠিক আছে, একটা লোক আসবে, তাকে বলবি যা যা দেখেছিস, সে আগের ছেলেটার ছবি আঁকবে ভেবে চিনতে বলবি কিন্তু, এই পুলিশসার কিন্তু নাহলে আবার ঠ্যাঙাবে
বডির পাশ থেকে ফরেন্সিক এক্সপার্ট মি মাইতি কানাইকে ডাকলেন
কানাই আর সৌভিক এগিয়ে গিয়ে দেখলো, মি মাইতি হাতে লেটেক্সের গ্লাভস পড়ে মৃতের থালার ভাত ঘাঁটছেন ডালে ভাতে মাখামাখি, থালার একপাশে সয়াবিন
কানাইকে মি মাইতি বললেন- ইনিশিয়ালি দেখে তো মনে হচ্ছে আবার এলুমিনিয়াম ফসফাইড, রোডেন্ট কিলার! গ্যাঁজলা উঠছে মুখ থেকে, চোখ কপালের দিকে ঠেলে উঠেছে, খুব হাই ডোজ, বলাই বাহুল্য পয়জনটা খুব রেডিলি পাওয়া যায় নাহলে যেভাবে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছে, নিশ্চিত ভাবেই বলা যেত আগের কেসটার সঙ্গে মিল আছেযাই হোক, যা স্যাম্পেল নেওয়ার সেগুলো তো নিয়েই নিচ্ছি কেমিক্যাল আর অটোপসি রিপোর্ট আপনি কালকের মধ্যেই পেয়ে যাবেন আর শিবুকে বলছি কাল ফার্স্ট আওয়ার বা ভোরের দিকে এসেই যেন ছবিগুলো তুলে নেয় আমি যদিও আমার বেসিক ক্যামেরায় কিছু ছবি তুলেই নিলাম, ইন কেস আপনা্র কথা কানে এলো, ছবি আঁকাতে হবে
কানাই মি মাইতিকে উত্তর দিতেই যাচ্ছিল, কিন্তু চোখ পড়লো টেবিলের উপর কানাই মি মাইতির কাছে একটি ল্যাটেক্স গ্লাভস চেয়ে নিলেন দুটো আঙুল দিয়ে পাতের ডাল মাখা ভাত ঘাঁটতে ঘাঁটতে বললেন- এটা কি ডাল আন্দাজ করতে পারছেন মি মাইতি?
-শুকিয়ে গেছে, মুসুর ডাল কি, কাল কেমিক্যাল এনালিসিস করে কনফার্ম করবো
কানাই চুকচুক শব্দ করে বললেন-এইটে দেখুন, বাটিভর্তি ডাল, পাতেও ডাল
মি মাইতি অবাক হয়ে বললেন-চোখেই পরেনি, বাটিতেই যদি ভর্তি ডাল থাকে, তাহলে পাতের ডাল কোথা থেকে এলো! আমি সিওর, পাতের ডালেই বিষ পাবোই  
-সেক্ষেত্রে ধরে নেওয়া যায় কি, পাতের ডাল আর বাটির ডাল এক জায়গা থেকে আসেনি, মানে কোন একটা ডাল অন্য কেউ অর্ডার করেছিলো, বা অন্য কোন সোর্স থেকে এসেছে?
মি মাইতি শ্রাগ করলেন-উপায় কি! ফুলকপির বদলে এইবার ডাল নিয়েই তাহলে পড়ি, স্যাম্পেলগুলো কুইক তুলে নিই
-তবু একবার প্যাথোলজিস্টকে বলবেন, স্টমাকে ফুলকপি আছে কিনা একবার যেন নিশ্চিতভাবে দেখে, দরকার হলে কেমিক্যাল এলালিসিসের জন্য অবশ্যই পাঠায় বলে কানাই গলা তুলে ভুঁইঞাকে ডেকে বললেন-হোটেলের মালিক নীলু গোঁসাইকে নিয়ে আসতে
কানাই মি মাইতির থেকে বিদায় নিয়ে হোটেলের ক্যাশবাক্সের সামনে এসে দাঁড়া্লেনরান্নাঘরে ঢুকবার দরজার একপাশে মালিকের বসার টুল, টুলের পাশে ক্যাশবাক্স ক্যাশবাক্সে এখন তালা দেওয়া ক্যাশবাক্সের উপরে দেওয়ালে টিনের পাতে মেনু লেখা সৌভিক একটা ঘুষি মেরে ক্যাশবাক্সের তালা ভেঙে ফেললো, ভিতরে খুচরো আর নোট কানাই মাথা উঁচু করে মেনু পড়ছিল সৌভিককে বললেন-অনেকদিন পাইস হোটেলে খাওয়া হয়না জানিস, কাল দুপুরে ভাবছি ডের্কাস কাটিয়ে দেব, তোর বউদিকে বলবো সকালে হাল্কা রান্না করতে
সাব-ইন্সপেক্টর ভুঁইঞা মালিক নীলু গোঁসাইকে নিয়ে এল
কানাই নীলুকে দেখে নাটকীয়ভঙ্গীতে মেনু পড়তে শুরু করলেন-মাছের থালি, ডিমের থালি, সয়াবিন, মিক্সড সবজি, আলুভাজা, মাছভাজা, চিকেন, চাটনিখাসির মাংস কই, বোর্ডে নেই কেন?
নীলু দূর থেকে সোমকে থাপ্পর খেতে দেখেছে, আগে থেকেই তাই তার হাত বুকের কাছে জড়ো করে রাখা কানাইকে উত্তর দিল- স্যার, খাসির মাংস আমাদের স্পেশাল, রোজ হয় না খাসি খাওয়ার লোক এই পাড়ায় নেই বেশি
সৌভিক জিজ্ঞেস করলো-ফুলকপি স্পেশাল হয় না কোনদিন?
-হয়, শীতকালে, খাসিটাই স্পেশালে বেশি করি স্যার
-মেনু কি রিপিট হয়? কানাই জানতে চাইলেন
-না সার রিপিট করতে পারি না থালির সঙ্গে একবাটি ডাল আসে, আর তা না হলে ডাল আলাদা ভাবেই অর্ডার করতে হবে
কানাই উত্তর শুনে সেকেন্ড কয়েক চুপ থাকলেন তারপর, প্রশ্ন করার ভঙ্গীতে না, যেন নিজেকেই বলছেন, এমনভাবে বললেন-আচ্ছা কেউ, খাসির মাংসের সঙ্গে ডাল আলাদা করে কেন অর্ডার করবেখাসির মাংস ৯০টাকা , এর সঙ্গে ১০ টাকার ডাল!খাসির মাংসের সঙ্গেই গোটাটা মেখে নেবে না?

নীলু ভাবলো তাকেই বোধহয় জিজ্ঞেস করা হচ্ছেস্যার, একেকজনের একেকরকম ক্ষিদে, কেউ বেশি খায় কেউ কম, কেউ ফেলাছাড়া করে খায় নিতেই পারে, খাসি আর ডাল, অনেকে খাসি আর ডিম অর্ডারও করে
কানাই ভুঁইঞাকে নির্দেশ দিলেন নীলুকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কানাই ঠিক করলেন এইখানে আর তদন্তের কিছু নেই ভুঁইঞাকে দুএকটা মামুলি নির্দেশ দিয়ে সৌভিককে বললেন-চল এইবেলা তাড়াতাড়ি কেটে পড়ি,এইবার মিডিয়া এসে পড়লো বলে ক্রাইম সিনে যেন ঢুকতে না পারে, স্টাফদের বলে দে আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিবুকে পাঠা ছবি তুলতে, ওয়াইড এঙ্গেল অবশ্যই তোলে যেন এই কেসেও আমার একটা টাইমলাইন দরকার, দেবোত্তম সন্ধে থেকে কোথায় ছিল, কি খাচ্ছিলো, এই সব
মি মাইতি স্যাম্পেল কালেক্ট করছিলেন, কানাই তাকে গুডলাইট বলে শেষবারের মত একবার দেবোত্তম দাসের মৃত শরীরের পাশে দাঁড়ালেন মুখ খুবড়ে পড়েছে ভাতের থালার উপর চশমার ডাঁটি মাথার চাপে ভেঙে গুড়িয়ে গেছে মুখে আর আর চুলে ডাল ভাত মাখামাখি কানাই এইবার মুঠি দিয়ে চুল ধরে মৃতের মাথা তুলে ধরলেন, থালার দিকে তাকালেন, তারপর ধীরে নামিয়ে রাখলেন মি মাইতি কানাই এর কাছ থেকে লেটেক্স গ্লাভস চেয়ে নিলেন সেফ ডিসপোজালের জন্য
কানাই আর সৌভিক শুভরাত্রি জানিয়ে যখন গাড়িতে উঠছেন তখন বিভিন্ন মিডিয়ার চারটি ওবি ভ্যান আমহার্স্ট স্ট্রিটে পার্ক করছে মধ্যরাতেও রাস্তায় হাজারখানেক লোক, পুলিশ ভিড় সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে


প্যারাডাইস লজ

হাজার একটা কাজ সেরে সৌভিক যখন লালবাজারে ঢুকলো ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা সকাল এগারোটা ছুঁয়েছে প্রথমে যেতে হয়েছিল আমহার্স্ট স্ট্রিট থানায়, সেখানেই সব সন্দেহভাজনরা আছে জগমোহিনী ভোজনালয়ের কর্মচারিদের জামিনের মেয়াদ আজ শেষ হচ্ছে, জয়েন্ট সিপি সাহেব নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ হেফাজতের মেয়াদ বাড়াতে আর নতুন সন্দেহভাজন, নীলুদার হোটেলের নীলু গোঁসাই আর অন্যান্যদেরও আজ পুলিশ কাস্টডিতে নেওয়ার জন্য আবেদন করা হবে কোর্টে এই সব দরকারি কথাবার্তা থানার বড়বাবুর সঙ্গে সেরে সৌভিক গেছিল নিজের খোঁচরদের সঙ্গে কথা বলতে খোঁচররা গতরাতের ভিক্টিম চিট ফান্ডের দালাল দেবোত্তম দাসের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়েছে সন্ধে অবধি দেবোত্তম চিট ফান্ডের অফিসেই ছিলক্লারিকাল কাজকর্ম সেরে মেসের জন্য বেরিয়েছিল আটটা নাগাদ কোম্পানিতে কোন বন্ধু নেই, শত্রুও নেই, পসারও নেই তেমন মাস গেলে দালালি বাবদ হাজার বারো রোজগার মেদিনীপুরের গ্রামে বউ বাচ্চা আছে, তাদের খবর দেওয়া হয়েছে তারা এসে মর্গে গিয়ে বডি সনাক্ত করবে
লালবাজারে ঢুকে সৌভিক প্রথমেই গেল ফরেন্সিক সেলে সেখানে মি মাইতির সহকারীর থেকে রিপোর্ট নিল মি মাইতি এখনও ল্যাবে আসেননি নীলুদার হোটেলে কাজ সারতে সারতে ওনার ভোর হয়ে গেছিল সৌভিক খোঁজ নিল, ফটোগ্রাফার শিবু সিনে গেছিল কী না সহকারী জানালো, শিবুও কাল ভোরেই গিয়ে ছবি তুলে এনেছে সৌভিক সহকারীকে ছবির ব্যাপারে তাগাদা দিয়ে চেম্বারে ঢুকে দেখলো কানাই তোফা মেজাজে সিগারেট ধরিয়ে পা দোলাচ্ছেন!
ফরেন্সিকের ফাইলগুলো কানাই এর টেবিলে রেখে, প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট হাতে নিয়ে সৌভিক বিরক্তি প্রকাশ করে বললো-মাইরি কানাইদা, খুনের কেস, কোথায় রক্ত, গুলিগোলা নিয়ে ব্যাপার হবে, তা নয় কিসব ফুলকপি-বাধাকপি-খাসির মাংস নিয়ে ঘাঁটতে হচ্ছেকোলকাতার সিরিয়াল কিলারদের, মাইরি কোন ক্লাস নেই
কানাই ধোঁয়া ছেড়ে বললেন-দোষটা কোলকাতা শহরের না রে, পাইস হোটেলে মার্ডার হলে ফুলকপি আর খাসির মাংস নিয়েই ডিডাকশান করতে হবে
সৌভিক আঙুল দিয়ে ফরেন্সিক রিপোর্টগুলো দেখিয়ে বললো- কাল রাতের বাটির ডাল আর প্লেটের ডাল এক কম্পোজিশান, মুসুর ডালকিন্তু একটায় বিষ আছে, আরেকটায় নেই একই বিষ, এলুমিনিয়াম কি যেন বললো, যাই হোক, ইঁদুর মারার!স্টমাক ওপেন করা হয়েছিল, ফুলকপির কোন ট্রেস পাওয়া যায়নি, রান্নাঘরের স্যাম্পেলেও ফুলকপি নেইফরেন্সিক আর্টিস্ট গেছিল, দেবোত্তম দাসের উল্টোদিকে যে বসেছিল তার একটা ছবি আঁকার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ওয়েটারটা গোলমেলে বর্ণনা দিচ্ছে, তাই ব্যাপারটা আর এগোয়নি আমি দেবোত্তম দাসের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে দেখেছি সেখানে বিশেষ কিছু নেই, সাসপেক্ট নেইমামুলি চাকরি করে, সামান্য রোজগারএমন লোককে মেরে কারুর কোন লাভ হবে না
কানাই অ্যাস্ট্রেতে সিগারেট ঘষলেন, তিনি যেন সৌভিকের কথা শুনেও শুনছিলেন না
সৌভিক কথা থামিয়ে কানাই এর উত্তর শুনবে বলে তাকালো
কানাই বললেন- সকালে কি খেয়ে এসেছিস?
সৌভিক বিরক্ত হলো কানাই ফের জিজ্ঞেস করলেন
-রুটি জেলি, ওমলেট কফি
-আমি আজ বাড়ি থেকে ভাত খেয়ে আসিনি ব্রেকফাস্ট করে সকাল নটার মধ্যে অফিসে ঢুকে গেছি এমনকি জুতো পালিশও কাটিয়ে দিয়েছি
-সাত তাড়াতড়ি এসে কি করছিলে?
-সিপিসাহেবকে কাল রাতের ব্যাপারটা সংক্ষেপে বললাম, তারপর একটা নাটক করতে হবে বলে কিছু লোক ভাড়া করলাম আমার নিজের সোর্স তারাএকটা নাটক করে দেখবে তোর সোর্সে আর ভরসা রাখছি না আর আমার সোর্সগুলোরও মাসখানেক বসে গেঁটেবাত ধরে গেছে বলে কানাই হাসলেন
-এসব কি যে বলছো, কিছুই বুঝছি না সৌভিক বললো
কানাই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন
-চল, আজ আর ডেকার্সে না একটা পাইস হোটেলে যাব সেখানেই বাকিটা বলছি এই সামনেই লালবাজার থেকে দুশো মিটার, হেঁটে
তাড়া দিয়ে কানাই সৌভিককে তুলে নিলেন লাঞ্চ করার নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বেরিয়ে পড়তে হল বটে কিন্তু সকাল থেকে ঘোরাঘুরি করে সৌভিকের খিদে পেতে শুরু করেছিল সৌভিক তাই কয়েকটা ফোন সেরে কানাই এর সঙ্গে বেরিয়ে এল লালবাজার থেকে বেরিয়ে বাম দিকে বাঁক নিয়ে বউবাজার স্ট্রিটের ফুটপাথে দুই গোয়েন্দা মানুষের ভিড়ে মিশে গেলেন ঘড়ি, চশমার আর ওষুধের দোকান পেরিয়ে একটি ছোট গলিতে ঢুকলেন কানাই গলিটির দুদিকে বসত বাড়ি, গলির নাম দেখতে পেল না সৌভিক কয়েক পা আরো হাঁটার পর সৌভিক বুঝতে পারলো গলিটি আসলে কানা, আরো তিরিশ গজ গিয়ে শেষ হয়ে গেছে, আর গলির শেষ মাথায় একটি পাইস হোটেল লালবাজার থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথ কিন্তু সৌভিক নিশ্চিতভাবেই বলতে পারে যে আগে কখনও এখানে আসেনি কানাই আর সৌভিক এসে যে পাইস হোটেলটির সামনে এসে থামলেন তার নাম প্যারাডাইস লজ গেরুয়া রঙের একতলা বাড়ি দরজার বদলে রয়েছে বিশাল পাল্লা, পাল্লা দিয়ে ঢুকলেই খাওয়ার ঘর প্রতিটি টেবিলেই লোক ভর্তি দিনের ব্যস্ত সময় কানাই আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে রাস্তার উপরেই দাঁড়ালেন, আরো কিছু লোক গলিতে দাঁড়িয়ে খাবার ডাক পড়ার অপেক্ষা করছে হোটেলের ভিতর থেকে একটি ছেলে বেরিয়ে এসে অপেক্ষমান লোকদের বলে গেল, আরেকটু অপেক্ষা করতে, ব্যাচ শেষ হয়ে এল বলে
সৌভিক জিজ্ঞেস করলো- এই হোটেলটার খোঁজ কি করে পেলেন?
কানাই মুচকি হেসে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন- কি জানিস, যখন ট্রেনিং এ ছিলাম একজন রাজস্থানী বামুন ছিলেন আমাদের মাস্টারমশাই, পুলিশ ট্রেনিং এ তিনি বলতেন, হোয়েন থিংস গেট কমপ্লিকেটেড উই গো ব্যাক টু দা বেসিকস! যখন সব কিছু বড্ড বেশি জটিল হয়ে যায়, আমাদের শিকড়ের কাছে ফিরে যেতে হয় এই কেসটা নিয়েও ভাবতে গিয়ে আমার সেইটাই মনে হলসব কিছু বড্ড ঘেঁটে উঠছে, খুব জটিল হয়ে পড়ছে আসলে খুবই সোজা আর সরল কেস হয়তআমরাই জটিল করে ভাবছি এই ফরেন্সিক, কেমিক্যাল স্যাম্পেল এতকিছু পুলিশই জানে , খুনি কিন্তু জানে না, কোনদিনও জানবে নাসে আসবে, কাজ করার করে চলে যাবে তবু যে সে ফরেন্সিকে ধরা পড়ছে না , তার কারণ কি খুনির ফরেন্সিকে বিশাল বিদ্যে নাকি এর মধ্যে ফরেন্সিকের জটিলতা আদৌ নেই! খুনির নেহাত ভাগ্য যে ধরা পড়েনি, সিম্পল লাক!এই যে কোলকাতা পুলিশ কোনদিনও স্টোনম্যানকে ধরতে পারলো না, তার কারণ কি আমাদের রিসোর্সে তখন কিছুর অভাব ছিল? না, কোলকাতা পুলিশ স্টোনম্যানের আগে পরে অনেক সিরিয়াল কিলিং মিস্ট্রি সলভ করেছে করবেও, ভবিষ্যতে, কিন্তু স্টোনম্যান মিস হয়ে গেল কারণ ডিপার্টমেন্টে সেসময় একদম ফুটপাথে নেমে তদন্ত করতে পারেনি যারা মারা গেছে তারা ফুটপাথবাসী, যে মেরেছে, সেও হয়ত ফুটপাথবাসী এই খুনকে বুঝতে গেলে ফুটপাথের জীবনযাপনটা বুঝতে হবে তেমনি আমাদের এই কেসটা বুঝতে গেলেও পাইস হোটেলকে আগে বুঝতে হবেসেটা জয়েন্ট সিপিও বোঝেন না, ডিসি ডিডিও বোঝেন না! আনফরটুনেটলি, আমি আর তুইও বুঝি না পাইস হোটেল কিন্তু আমাদের ডেকার্স এর টিফিন ব্রেকের পাউরুটি ডিম, ঘুগনি না যে পাইস হোটেলে খাচ্ছে সে সারাদিনের নামে খাচ্ছে ২০ কি ৪০ টাকার মাছ ভাতের থালি চেটেপুঁছে সাফ করে দিয়ে খাচ্ছে তার মনস্তত্বটা না বুঝলে কেসটাও বোঝা কি  যাবে না আমি তাই ঠিক করলাম সবার আগে পাইস হোটেলকে বুঝবো তোর বউদিকে বললাম, আজ আর আমার জন্য ভাত না বসাতে, ব্রেকফাস্ট সেরেই অফিসে চলে এলাম

প্যারাডাইস লজের কর্মচারিটি এসে ডাক দিল আগের ব্যাচের খাওয়া শেষ, লোকজন ধীরেসুস্থে উঠছে, হাত ধুচ্ছে, পরের ব্যাচের লোকজন ঘাড়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে জায়গা দখল করবে বলে কানাই সিগারেট ফেলে, জুতো দিয়ে পিষে, মাথা বাঁচিয়ে খাওয়ার ঘরে ঢুকলেন সৌভিক আঙুল তুলে দেখালো, দূরের কোণে একটি টেবিল ও মুখোমুখি দুটি চেয়ার ফাঁকা দুজনে গিয়ে চেয়ার দখল করলেন টেবিলে তখনও আগের খদ্দেরের এঁটো বাসন হোটেলের কর্মচারি এসে কানাইদের থেকে অর্ডার নিল আর এঁটো বাসনগুলি টেবিলের উপর একটির উপর আরেকটি চাপিয়ে রাখলো কানাই অর্ডার করলেন মাছ ভাতের থালি সঙ্গে এক্সট্রা আলুভাজা, সৌভিক বললো চিকেন থালি
কর্মচারিটি খাবার নিয়ে এল এঁটো থালাগুলো এসে তুললও, টেবিল আর মোছা হল না
সৌভিক মাথা নিচু করে খাওয়া শুরু করতে যাচ্ছিল, কানাই আবার বলতে শুরু করলেন-কেবলমাত্র পাইস হোটেলে খেতে এলেই পাইস হোটেলকে একদিনে বুঝে যাবো এত বোকা আমি নই! আমি বরং একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে পাইস হোটেলকে বুঝবার চেষ্টা করবো কিন্তু সেটাও একা করা সম্ভব নয় সে জন্য কুশীলব চাই যারা সাহায্য করবে আমার খোঁচরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করলাম ডিপার্টমেন্টে ক্লোজ ছিলাম বলে বিগত মাসকতক যোগাযোগ ছিল না ডাক দিতেই সবাই সক্কাল সক্কাল লালবাজারে হাজির সবাইকে নির্দিষ্ট কাজ বুঝিয়ে দিলাম মোদ্দা কথাটা হল, কয়েকটা নাটক করতে হবে, বা এক্সপেরিমেন্টও বলা যেতে পারে
সৌভিক অবাক হয়ে কানাইচরণের দিকে তাকিয়ে ছিল কানাই বলে চললেন-কাল রাতভর ভেবে দেখলাম সমস্যাটা খুব সোজা ভিক্টিমদের পাতে এমন একটা পদ এসেছে যেটা তাদের পাতে থাকার কথা নয় জগমোহিনী ভোজনালয়ে সহদেব আর রজনীকান্তের পাতে পাওয়া গেছে ফুলকপি যদিও তারা ফুলকপি অর্ডার করেনি আর নীলুদার হোটেলে পাওয়া গেছে অতিরিক্ত ডাল এই অতিরিক্ত ডাল আর ফুলকপি ভিক্টিমরা অর্ডার না করলে কোথা থেকে এল? এটাই প্রাথমিক প্রশ্ন কিনা!
সৌভিক মাথা হেলাল
-প্রথমত, বাইরে থেকে কেউ হোটেলে ঢুকে ভিক্টিমদের পাতে ঢেলে দিতে পারে, দ্বিতীয়ত, হোটেলের মধ্যেই অন্য টেবিল থেকে কেউ এসে ভিক্টিমদের পাতে ঢেলে দিতে পারে, তৃতীয়ত, আগের লোকের ফেলে যাওয়া আইটেম ভিক্টিমরা নিজেদের পাতে তুলে নিতেও পারে। আরেকটা সম্ভাবনা আছে, হোটেলের কর্মচারি কেউ যদি কালপ্রিট হয় যদিও এই শেষ সম্ভাবনাটিকে আমি ধর্তব্যের মধ্যে আনছি না যেহেতু ফরেন্সিক ইতিমধ্যেই এদেরকে ক্লিনচিট দিয়েছে এখন কথা হচ্ছে, পাইস হোটেলকে না বুঝলে এই সম্ভাবনাগুলোর মধ্যে কোনটি আদৌ সম্ভব বা বাস্তবে ঘটেছে বলা মুশকিল
-আমার খোঁচররা তাই কাস্টমার সেজে এই মুহুর্তে আমাদের সঙ্গেই তিনটি আলাদা আলাদা টেবিলে ছড়িয়ে আছে খোঁচরদের স্বাভাবিক কারণেই তুই চিনিস না, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে লাভ নেই, ডিপার্টমেন্টাল এথিক্স বলে একটা ব্যাপার তো আছে না কি! প্রথম দলের কাজ হচ্ছে, তাদের টেবিলে বসা আগের লোকের অবশিষ্ট খাবার ওয়েটার এসে তুলে নিয়ে যাওয়ার আগেই নিজের পাতে তুলে নেবে আর এমন হাবভাব করবে যাতে ওয়েটার বা পাশের টেবিলের সাধারন লোকজন কিছুই বুঝতে না পারে দ্বিতীয় দলের লোকজন টেবিলে বসে ভদ্রভাবে খাবে, কিন্তু তাদের এক সাথী বাইরে অপেক্ষা করছে কিছুক্ষণ পরেই সে হোটেলে চুপচাপ ঢুকে একজনের পাতে একবাটি খাবার ঢেলে খেবে সেই খাবারটি এই হোটেলের থেকেই আগে থাকতে সংগ্রহ করে রাখা আর শেষ দল এখন খাচ্ছে, সেই দলের একজন খাওয়া শেষ হওয়ার মুখে উঠে পাশের টেবিলের কোন একজন সাধারন লোকের সঙ্গে কথা বলে, তার পাতে নিজের বেঁচে যাওয়া কোন একটি খাবার দেওয়ার চেষ্টা করে যাবে বলাই বাহুল্য হোটেলের কর্মচারিরা এই বিষয়ে বিন্দুবিসর্গও জানে না, বাকি খদ্দেররাও জানে না যে তারা আমার এক্সপেরিমেন্টের অংশ জানে কেবল, হোটেলের মালিক, তিনিও আমার অন্যতম খোঁচর, যদিও এইমুহুর্তে তিনি হোটেলে উপস্থিত নেই তার জায়গায় ক্যাশ সামলাচ্ছে একজন কর্মচারি সবশেষে এই নাটকের প্রধানতম কুশীলব, আমিই, আমার কাজ এই কোণের টেবিলটিতে বসে সবার প্রতিক্রিয়া, মুখভঙ্গি ও ঘটনাপরম্পরা নজর রাখা
কানাইচরণের থালায় মাছ পড়েই রইলো, কানাই থালার দিকে একবারের জন্যও তাকালেন না যন্ত্রবৎ ডালভাত খেতে খেতে হোটেলের টেবিলে টেবিলে তার নির্দেশিত নাটকের কুশীলবদের অভিনয় দেখলেন সাধারন দর্শক ও হোটেল কর্মচারিদের নজর করলেন সৌভিক দেওয়ালের দিকে মুখ করে বসেছিল, তাই কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না বরং মন দিয়ে চিকেন থালি খাছিল ব্যাচ শেষ হওয়ার পর একটি গ্লাসে জল নিয়ে রান্নাঘরের পাশের কলতলায় গিয়ে মুখ ধুতে ধুতে সৌভিক জিজ্ঞেস করলো- তা নাটকে শেষমেষ কি হলো? কোন সিদ্ধান্তে আসা গেল কি?
কানাই বললেন-খুনিকে বুঝতে আমরাই শুধু ভুল করিনি, খুনি নিজেই মস্ত ভুল করে বসে আছে

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা

প্যারাডাইস লজ থেকে লালবাজার, ফেরার এই দশ মিনিট পথ সৌভিক আর কৌতুহল ধরে রাখতে পারছিল না কানাইচরণ শুধু বলছিলেন- আওয়াজ না করে ভাবছি, আওয়াজ না করে ভাবছি, সব বলবো
লালবাজারে নিজেদের চেম্বারে দুজন যখন ঢেঁকুর তুলতে তুলতে ফিরে এলেন, কানাই এর টেবিলের উপর ফটোগ্রাফার শিবুর কাছ থেকে আসা একটা পার্সেল জায়গা পেয়েছে কানাই পার্সেল সরিয়ে রেখে, একটা সিগারেট ধরালেন, সৌভিককেও দিলেন
-জঙ্গলের মধ্যে যখন কোন পথই পাওয়া যাচ্ছে না, তখন দুটো গাছের মাঝে যদি এতটুকু  আগাছাহীন ফাঁক থাকে তার মধ্যে দিয়েই পথের খোঁজ করতে হয় এই কেসটায় সেই সামান্য ফাঁকটুকু হল ফুলকপি আর খাসির মাংস কানাই সিগারেট খেতে খেতে বলছিলেন-প্রথম কেসে মৃতদের প্লেটে ফুলকপি কি করে এল আর দ্বিতীয় কেসে কি করে খাসির মাংস এল শুধু এটুকু বুঝতেই আমি আজকের গবেষণা করলাম এই গবেষণার রেজাল্টটা আগে জানানো দরকার কেস রিপোর্টেও এটা লিখতে হবেপ্রথম কেসে একদল লোক খাচ্ছে, এমন সময় বাইরে থেকে একজন এসে তাদের পাতে ডাল ঠেলে দিল যেই ডাল ঢেলে দিল, ঘটনাটা কিন্তু হোটেলের সার্ভারদের চোখে পড়েছিল তারা হইহই করে উঠলো তোর মনে থাকবে, প্যারাডাইজে আমরা খাওয়ার সময় একবার গোল হয়েছিল তাই এরকম কিছু যদি জগমোহিনী বা নীলুদার হোটেলে হয়ে থাকতো, সার্ভাররা আমাদের বলতো, বা এখনও চাইলে তুই পুলিশ কাস্টডিতে ফোন করে জেনে নিতে পারিস দ্বিতীয়ত, প্যারাডাইজে একজন সাধারন লোক খাচ্ছিল, আমার খোঁচর নিজের খাওয়া শেষ করে লোকটার কাছে যায় আর বলে এই আমার বাটিতে অনেকটা সবজি রয়ে গেছে আপনি কি নেবেন! লোকটি বেশ বিরক্ত হয়, এবং জানায় যে সে নেবে না কারণ , হয়ত, লোকটির মনে হয়ে থাকবে, বাটিতে আপত্তিকর কিছু থাকবে, ড্রাগসের কথা মাথায় আসতে পারে, পেপারে বিষের কথাও নিশ্চই পড়েছে এই দুই নাটক থেকে বোঝা গেল যে এভাবে বিষাক্ত ফুলকপি অন্যের পাতে পৌঁছবে না এইবার এল তৃতীয় সম্ভাবনা আমার এক খোঁচর তার খাওয়া শেষ না করেই এক আস্ত বাটি ডাল টেবিলে রেখে বিল মিটিয়ে উঠে যায় আর দূরের, কোণের টেবিল থেকে আমি লক্ষ্য করি, উল্টোদিকের চেয়ারের একজন জেনারেল পাবলিক ডালটা নিজের থালায় নির্দ্বিধায় ঢেলে নেয় মজার ব্যাপার হল, ঘটনাটা সার্ভারদের চোখেও পড়েনি চোখে না পড়াটাও স্বাভাবিক, কারণ সার্ভাররা দাঁড়িয়ে পরিবেশন করছে, খাওয়ার টেবিল তাদের আই লেভেল থেকে নিচুতে
সৌভিক বললো- ঠিক আছে, মেনে নিলাম, একটা জোরালো সম্ভাবনা, হতেই পারে, ওই বিষাক্ত ফুলকপি বা ডাল আসলে আগের লোকের ফেলে যাওয়া এঁটো নীলুদার হোটেলে এমনটা হয়েও থাকতে পারে, আমরা থার্মোগ্রাফে দেখেওছি যে উল্টোদিকে খুন হওয়ার খানিক আগেও কেউ বসে ছিল কিন্তু জগমোহিনীতে তো উল্টোদিকে কেউ ছিল না ভিকটিমরা যদি উঠে গিয়ে অন্য টেবিলের ফেলে যাওয়া ফুলকপি নিয়ে আসতো, তাহলে তো সার্ভারদের চোখে পড়তোই একবার দাঁড়ালেই তারা সার্ভারদের আই লেভেলে চলে আসবে
-জগমোহিনীতেও টেবিলের উল্টোদিকে কেউ ছিল কিন্তু জগমোহিনীতে থার্মোগ্রাফের সুযোগ না থাকায় আমরা সেটা বুঝতে পারিনি নীলুদার হোটেলের সার্ভারও কিন্তু প্রথমে অস্বীকার করেছিল উল্টোদিকে কেউ বসার কথা! আমার মনে হয়, পাইস হোটেলে সারাদিন এত লোক যাওয়া আসা করছে যে এরা ব্যাচ ধরে ধরে টেবিলের লোকেদের উপস্থিতি মনে রাখে মানে আগের ব্যাচের লোকজনের হিসেব আগের ব্যাচেই শেষ স্মৃতিতে আর কোন ছাপ থাকছে না জগমোহিনীতে আমরা যদি থার্মোগ্রাফ করতেও পারতাম, আর তাতে যদি উল্টোদিকে কা্রো উপস্থিতি বোঝাও যেত, তবু আমার বিশ্বাস যে সার্ভাররা কিছু মনে করতে পারত না,কারণ জগমোহিনী নীলুদার হোটেলের চেয়ে অনেক বেশি খদ্দের পায়
-এই অবধি মেনে নিলাম, যে উল্টোদিকের টেবিলে কেউ বসেছিল, যে ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার অবশিষ্ট রেখে টেবিল থেকে উঠে যাচ্ছে আর সেই খাবার তুলে নিয়ে, চুরি করাই বলা যায় একে, উল্টোদিকের লোক মারা যাচ্ছে প্রায় বলা যায়, মৃতদের লোভই তাদের মারা যাওয়ার কারন কিন্তু আপনি খুনির দিক থেকে এই ব্যাপারটা ভেবে দেখুন খুনি এখানে প্রত্যক্ষভাবে বিষপ্রয়োগ করছে না, সে বিষ মাখা খাবার ফেলে যাচ্ছে কারণ সে পাইস হোটেলের খদ্দেরদের মানসিকতা জানে যেমন আপনি আগে বলেছেন যে খদ্দেরদা দিনের খাওয়া খেতে আসছে, তারা এঁটো পাত থেকে ফুলকপি তুলে নেবে কিন্তু নীলুদার হোটেলে ডালে বিষ পাওয়া গেছিল! ভিক্টিম আগের লোকের বাটির ডাল তুলেছিল, অথচ এক্সট্রা ডালের দাম মাত্র দশটাকা আরেক বাটি ডাল প্রয়োজন হলে সে সার্ভারের কাছেও চাইতে পারতো, চুরি না করে খুনি তাই খুন করতে চাইলে ডালে কেন বিষ মেশাবে,সে খাসির মাংসতেই বিষ মেশাবে, যেমন জগমোহিনীতে ফুলকপির স্পেশালে বিষ মিশিয়েছিল

কানাই ফুরিয়ে আসা সিগারেট অ্যাসট্রেতে ঘষে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন-এইখানেই আমরা খুনিকে বুঝতে ভুল করেছি আর খুনিও নিজে মস্ত ভুল করে বসে আছে আমরা পাইস হোটেলের কিছু দিক জানি বলেই খুনিও পাইস হোটেলকে বুঝে নিয়েছে হয়ত তা নয় তুই ঠিকই বলছিস, নিশ্চিতভাবে খুন করতে চাইলে প্রতিবার স্পেশালেই বিষ মেশাবে, তাতেই উল্টোদিকের লোককে আকৃষ্ট করা সোজা প্রথমদিন তাই করেছিল, তাহলে দ্বিতীয়দিন কেন রেগুলার আইটেমে বিষ মেশাতে গেল! কারণ অন্যকে খুন করতে সে চায়নি, খুনি চেয়েছিল আসলে নিজেকেই খুন করতে ইয়েস, এটা সিরিয়াল কিলিং এর ঘটনা নয়, আমার সিদ্ধান্ত, এটা রিপিটেড এটেম্পট অফ সুইসাইড
-সুইসাইড?
-হ্যাঁ, খুনি বলব নাকি এবার আত্মহত্যাকারী বলাই ভালো, প্রথমদিন জগমোহিনীতে আসে মনে মনে ঠিক করে এসেছে আত্মহননের পথ বেছে নেবে কি কারনে আত্মহত্যা করবে সেটা যদিও আমরা এখনও জানিনা স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুর আগে পৃথিবী্র রূপ-রস-গন্ধ আরেকবার অনুভব করতে অনেক আত্মহত্যাকারীই চায়, বহু কেসে দেখা গেছে আমাদের কেসেও আত্মহত্যাকারী তার প্রিয় খাবার খেয়ে মারা যেতে চায় তাই সে সেদিনের স্পেশাল ফুলকপি অর্ডার করে সঙ্গে  ডাল আসে ডাল খাওয়া শেষ করে ফুলকপিতে বিষ মেশায়, কিন্তু ফুলকপি আর খাওয়া হয়ে ওঠে না ইতস্তত করতে থাকে, ইতিমধ্যে টেবিলে অন্য খদ্দেররা এসে পড়ে আত্মহত্যাপ্রবণ লোকটি উঠে পড়ে নতুন খদ্দেরদুটি স্পেশালের ফুলকপি দেখে নিজের পাতে লুকিয়ে নেয় সম্ভবত, ভাতের স্তূপের মধ্যে ফুলকপিগুলো লুকিয়ে নিয়েছিল এবং পরিণতি যা হয়েছিল,আমরা ইতিমধ্যেই জানি আত্মহত্যাপ্রবণ ছেলেটি সম্ভবত স্থানীয় ছেলে, তার কানে এই মৃত্যুর কথা চলে গেছেই হয়ত আফশোষ করে, কিন্তু সে তো নিজের প্রাণ নিতে বধ্যপরিকর! তাই পরের হোটেলে যায়-নীলুদার হোটেল এই বার সিদ্ধান্ত নেয়, কোন কারণে ফের যদি তার উদ্যোগে খামতি থেকে যায়, সে আর স্পেশালে বিষ মেশাবে না, সে বিষ মেশায় নিতান্ত ডালে স্পেশাল খায়, খাসির মাংস, মৃত্যুর আগে খাসির মাংস খেয়ে নিজেকে হয়ত শেষবারের মত স্বান্তনা দিতে চেষ্টা করে বোধহয় পাইস হোটেলের খাসির মাংসের এমন কোন গুণ আছে যা মৃত্যুমুখী মানুষকেও জীবনে টেনে আনে লোকটির আর ডাল খাওয়া হয় না এবারের মতও মনোবাসনা পরিত্যাগ করে উঠে পড়ে কিন্তু যেটা এই খুনি বুঝতে পারেনি, যে সামান্য ডালও পাতে তুলে নেওয়ার লোক পাইস হোটেলে আছে
সৌভিক মাথা নাড়লো-কেস দাঁড়িয়ে গেছে, একটাই প্রশ্ন, বিষ কি করে হোটেলে নিয়ে এলো? তোমার মনে হয় না, রাইস ট্যাবলেটের পুরিয়া খুলে হোটেলে বসে ডালে মেশালে সেটা কিছু লোকের চোখে পড়তই?
অনভ্যাসের ভাতডাল খেয়ে কানাইচরণের দিবানিদ্রা পাচ্ছিল, হাই তুলতে তুলতে তুড়ি দিয়ে বললেন-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ আপাতত পাওয়া গেছে, সেই পথে কে গেল, সেইটে বোঝা বাকি! আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার আন্ডারে কতগুলো পাইস হোটেল আছে? সবগুলোকে ওয়াচে রাখা যায় কি?
-কোনদিন থানায় পোস্টিং পেলে বুঝতেন, -দেড়েক পাইস হোটেল আছে ওই চত্বরে, কতগুলো স্কুল-কলেজ আছে বলুন তো! কলকাতা ইউনিভার্সিটি!
-আমার ধারনা, এত বার ভুলের পরেও লোকটি থামবেনা, সুইসাইড এর এটেম্পট এনেবেই, যতক্ষণ না সাকসেসফুল হচ্ছে
সৌভিক বললো-আমি কয়েকটা বেশি পেট্রোল কার পাঠানোর ব্যবস্থা করছি নজরদারির জন্য
-তাই কর বাপ, সিপিসাহেবকেও বলেটলে রাখিস, আমি আর চোখ মেলে থাকতে পারছি নাবলতে বলতে কানাই দিবানিদ্রা দিলেন


অলংকরণঃ লেখক 


নিদ্রাভঙ্গ
কানাই এর ঘুম ভাঙলো ক্রিমিনাল রেকর্ডস সেকশানের দিদিমণির গলা শুনে
-কি মশায় দিনের বেলা পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছেন?
কানাই চেয়ারের মধ্যেই ঢুলে পরেছিলেন দিদিমণিকে টেবিলের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজেকে সামলে উঠে বসে দিদিমণিকেও আপ্যায়ণ করলো দিদিমণি ক্রিমিনাল সেকশানের রেজিস্ট্রার কানাইচরণ যতদিন ক্লোজড ছিলেন ততদিন দিদিমণিই পুরানো কেসের এর ফাইলপত্তর যোগান দিয়ে কানাইকে চাঙ্গা রেখেছিলেন বয়স্ক, পৃথুলা মহিলা তাঁতের শাড়ি আর সোনালি চশমা পড়েনবেয়ারাকে ডেকে কানাই নিজের আর দিদিমণির জন্য চা আনালেন চা খেতে খেতে দিদিমনি নানাধরনের গল্প জুড়লেনইতিমধ্যে সৌভিকও এসে পড়েছে আর চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিয়েছে যে সিপিকে আজকের মত ম্যানেজ করে এসেছে চা আর গল্প ফুরানোর পর দিদি কানাই এর টেবিলের উপর পড়ে থাকা কেস ফাইল নিয়ে পড়লেনবয়সের দোষে কানাই আর মানা করতে পারলো না দিদিমনির মনোযোগ ঘোরানোর জন্য বললেন-অনেকদিন সেসিল বারে যাওয়া হয় না, যাবেন একদিন?
 দিদিমণির মনোযোগ ঘোরানো গেল না, তিনি শুধুহুঁবলে সাব-ইন্সপেক্টর ভুঁইঞার রিপোর্ট পড়ার চেষ্টা করলেনএবং ব্যর্থ হলেন কেস ফাইল ছেড়ে দিদিমণি এরপর শিবুর তোলা ছবিগুলি নিয়ে পড়লেন কাষ্ঠং শুষ্কং কেস ফাইলের চেয়ে অন্তত ছবিগুলি তার কাছে মনোরঞ্জক ঠেকলো
- বাবা, কি গ্রুসাম ব্যাপার মশায় ভাতের থালার উপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে! কলেজ লাইফে কত যেতুম পাইস হোটেলে তখন তো এইসব একদম ছিল না
কানাই জিজ্ঞেস করলেন-কতদিন আগের কথা সেসব?
দিদিমণি দুষ্টু হেসে টা টা করে চলে গেলেন কানাই চেম্বারের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলেন তারপর চোখ নামালেন টেবিলের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কেস ফাইল আর ফটোগুলোর দিকে কানাই সব কাগজ পত্র গুছিয়ে রাখতে ব্যস্ত হলেন তার চোখ পড়লো ফরেন্সিক ফটোগ্রাফার শিবুর তোলা একটি ছবির দিকে ওয়াইড এঙ্গেলে তোলা জগমোহিনী ভোজনালয়ের ছবি জগমোহিনীর দরজা দিয়ে ঢুকেই ক্যাশবাক্সের পাশে দাড়িয়ে গোটা খাবার ঘরটির ছবি তুলেছে শিবু কানাই কিছুক্ষণ ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইলেনতারপর সৌভিককে ডাকলেন
-ছবিটায় কিছু মিসিং দেখতে পাচ্ছিস?
সৌভিক চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে কানাই এর হাতে ধরা ছবিটির দিকে তাকালো, আট বাই ছয় এর প্রিন্ট, কোন এফেক্ট মারা হয়নি ব্রোমাইড ওয়াশ করে শিবু ছবি দিয়ে গেছে সৌভিক তার স্মৃতি থেকে অপরাধস্থলটিকে মেলানোর চেষ্টা করলোঘরে টেবিল আর চেয়ারের সারি, নিচে এঁটো খাবার পড়ে আছে দূরের টেবিলে ভিক্টিমদের বাসি বাসন গুলো নেই, কারণ ফরেন্সিকের শিক্ষানবিশ সেগুলো সেফ ডিজপোজালে নিয়ে গেছিল চক দিয়ে দাগ কাঁটা আছে কুলুঙ্গিতে খাবারের বালতি অবধি আছে
-না , সবই তো আছে দেখছিআমরা সেদিন যেমন যেমন দেখেছিলাম সৌভিক বললো
-সেদিন যা দেখেছিলাম, সেগুলো তো আছেই, কিন্তু যা থাকার কথা সেরকম কিছু কিছু জিনিস নেই বস্তুতঃ, এখন বুঝতে পারছি সেদিনও ছিল না আমাদের চোখে পড়েনি
সৌভিক নিজের মাথা ছবির সামনে নিয়ে এলো-কই না, কি থাকবে? টেলিভিশান?
-সেসব না, দেখছিস, অনেক টেবিলে নুনদানি নেই, আর অন্য টেবিলে আছে?
-হ্যাঁসৌভিক গুনে বললো-চারটিতে আছে, বাকি ছয়টায় নেই, ভিক্টিমদের টেবিলেও নেই এতে অস্বাভাবিক কী আছে চারটে নুনদানি তো আছেসেগুলিই বাকিরা ব্যবহার করবে
কানাইচরণ তার টেবিলের উপর ছড়িয়ে থাকা কাগজপত্র থেকে আরেকটি ফটো বের করে আনলেন আজ সকালে তোলা নীলুদার হোটেলের ওয়াইড এঙ্গেলে তোলা ছবি আমহার্স্ট স্ট্রিটের দিকে দাঁড়িয়ে নীলুদার খাবার ঘরের ছবি তুলেছে শিবু কানাইচরণ প্রিন্টের উপর হাত রাখলেন ম্যাট ফিনিশ চকচক করছে সৌভিক ঠাউর করার ছবিতে নুনদানি খোঁজার চেষ্টা করলো
-কই এই ছবিতে তো কোন নুনদানিই নেই
কানাই আঙুল দিয়ে ঠুকে বললেন-ভালো করে খেয়াল কর, নুনদানি নেই, কিন্তু ছোট ছোট কয়েকটা বাটি টেবিলের উপর রাখা হয়েছে দেখতে পাচ্ছিস? সস্তার হোটেল, হয়ত আলাদা করে নুনমরিচের দানি রাখেনি, ছোট পাত্রে নুন রেখেছে সুবিধামত কিন্তু এখানেও সব টেবিলে নুনদানি নেই ব্যস্ততার সময় সার্ভাররা খাবার সার্ভ করবে, নাকি টেবিলে টেবিলে নুন পৌঁছে দেবে
সৌভিক নুন এর পাত্রগুলি দেখতে পেয়েছে, সে সন্দেহের সঙ্গে বললো- কি বলতে চাইছেন দাদা, কেউ নুনদানি চুরি করেছিল?
-করে থাকলে আমি আশ্চর্য হব না নুনদানি চুরি করলো, তারপর সেই নুনদানিতে করেই বিষ নিয়ে এল নুনদানিতে রাইস ট্যাবলেট গুঁড়ো করে আনলে আরেকটাও লাভ আছে, ঠিক নির্দিষ্ট বাটিতে বিষ নিঁখুত ভাবে ফেলাও যাবে, মিশেও যাবে
-কিন্তু চুরি করা নুনদানি নিয়ে এলে তো ধরা পড়ে যাওয়ার চান্সও থাকবে?
কানাই একমুহূর্ত ভাবলেনবললেন-হতে পারে, পরপর কয়েকদিন নুনদানি চুরি করা হলো হোটেলে নুনদানি যথেষ্ট নেই, এই অজুহাতটা তৈরি করা গেল ফলে শুধু একা অপরাধী নয় আরো অনেকেই নিজস্ব নুনদানি নিয়ে আসবে তাহলে অপরাধীর নিজস্ব নুনদানি হোটেলের কর্মচারিদের চোখেও পড়বে না
-এত কষ্ট করবে কেন? একটা পুরিয়া বানিয়ে আনলেই হততারপর সুযোগ বুঝে মিশিয়ে নিত
-সেক্ষেত্রেও সমস্যা এটাই যে কেউ আলাদা করে খেয়াল করেই ফেলবে
সৌভিক কানাই এর যুক্তি মেনে নিয়ে বললো-নুনদানির ব্যাপারটা কি চেক করে দেখবো?
কানাই কাগজপত্র আর ছবি ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে বললেন-নিজেরাই গিয়ে চেক করবো, গাড়িটাকে লালবাজারের সামনে আসতে বল আমহার্স্টস্ট্রিট থানার লকআপে শ্যামকান্ত আর নীলু গোঁসাই আছে না?
সৌভিক তাড়াতাড়ি গাড়ির ব্যবস্থা করলো প্রায় আধ মাইল দূরে কোয়ালিস পার্কিং করা ছিল কানাই আর সৌভিককে নিয়ে কোয়ালিস যখন আমহার্স্ট স্ট্রিট থানায় পৌঁছল ততক্ষণে বিকেল পাঁচটা, একটা গুমোট গরম শহরকে ছেয়ে ফেলেছে ভুঁইঞাকে মেসেজ করে সৌভিক জানিয়ে রেখেছিল যে তারা আসছে ভুঁইঞা কানাই আর সৌভিককে খাতির করে প্রথমে বড়বাবুর ঘরে নিয়ে গেল অ্যাপায়ন আর পালটা সৌজন্য পেরিয়ে কানাই ভুঁইঞার ঘরে এসে সিগারেট ধরিয়ে নীলু গোঁসাই আর শ্যামকান্তকে কাস্টডি থেকে নিয়ে আসতে আদেশ দিলেন অনিচ্ছাকৃত খুনের চার্জ দিয়ে আপাতত হোটেলের কর্মচারিদেরকেই পুলিশ লকআপে রাখা হয়েছে দুই হোটেলের দুই মালিক এসে কানাই এর সামনে হাতজোড় করে দাঁড়ালো তাদের চোখ দেখে মনে হবে কোন পুলিশকেই তারা আর জীবনে বিশ্বাস করবে না দুজনের কোমরে দড়ি বাঁধা তিনজন কনস্টেবল পাহারা দিচ্ছে
কানাই বললেন- আমি জানি তোমরা দোষী নও, আর আমি কথাও দিচ্ছি পরের দিন কেস কোর্টে উঠলেই তোমাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য পুলিশের ল-ইয়ার আদালতে বলবে যে তোমরা নির্দোষ কিন্তু তার জন্য আমাদের আসল দোষীকে কিন্তু খুঁজে বের করতেই হবে আর সেটার থেকে আমরা এইটুকু দূরে দাঁড়িয়ে আছি তোমরা যদি একটা খবর দাও, ব্যস তাহলেই...
বয়েসে তুলনায় অল্প নীলু গোঁসাই কাতর গলায় বললো-আমি কিছু জানিনা স্যার, আমাকে ছেড়ে দিন
-আহা, কি জিজ্ঞেস করছি আগে শুনেই নাও তোমাদের হোটেল থেকে কি ইদানিং নুনদানী, নুনের বাটি চুরি টুরি হয়েছে
নীলু উত্তর দেবার আগেই শ্যামকান্ত বলে উঠলো-হ্যাঁ হ্যাঁ বাবু, খুব, ওই ছে্লেদুটো মারা যাওয়ার আগের হপ্তাখানেক জুড়ে প্রায় প্রতিদিন একটা দুটো করে নুনদানি দেখি ভ্যানিস প্রথম প্রথম সার বুঝতে পারিনি একসময় দেখি টেবিল জুড়ে একটাও নাই তারপর স্টকে তো থাকেই, আরো কয়েকটা প্লাসটিকের পাত্র দিলাম, দুদিনে সেটাও ফাঁকা হতে শুরু করলো কি ছিঁচকে চোর সার, দুটাকার জিনিস! এসব তো হোটেলে হয়েই থাকে, দুটাকার জন্য কী আর কাস্টমারের সঙ্গে বাওয়াল করা চলে ছেলেদের বললাম, দুদিন চুপচাপ থাক, টেবিলে টেবিলে নুন দেওয়ার দরকার নেই, আপসেই দেখবি নুনদানি চুরি থেমে গেছে, তো তার আগেই তো এই খুনের কেস বলতে বলতে শ্যামকান্তের গলা ধরে এল
কানাই নীলু গোঁসাই এর দিকে তাকালো
-সেম কেস স্যার, নুন-লঙ্কার বাটি দেখি স্যার ঝেঁপে দিচ্ছে আগেও আমাদের হোটেলে চামচ, চাটনির বাটি চুরি হয়েছেসব পাতাখোরদের কাজ সার গলিয়ে বিক্রি করে সারআমি কয়েকটা পিসকে চিনি স্যার ঠিকানা নেবেন?
কানাই বললেন-না ঠিকানায় আর কাজ নেই, কাল পরশুর দিকে ছাড়া পেয়ে যাবে
কনস্টেবলরা নীলু আর শ্যামকান্তকে নিয়ে চলে গেল
সাব-ইন্সপেক্টর ভুঁইঞা আর সৌভিক থ মেরে দাঁড়িয়ে ছিল
কানাই ধমকে বললো-এখনও কি আমাকে বলে দিতে হবে কী করতে হবে!
সৌভিক আর ভুঁইঞা সঙ্গেসঙ্গে কাজে লেগে পড়লো আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার জুরিসডিকশানে ভুঁইঞার হিসেবে নথিভুক্ত পাইস হোটেলের সংখ্যাই একশো তিন, এবাদে আরো ত্রিশ কি চল্লিশ বেআইনি খাওয়ার ঘর রয়েছে কানাই নির্দেশ দিলেন খাতায় কলমে থাকা হোটেলগুলো দিয়েই শুরু করতে তারমধ্যে খবর পাওয়া না গেলে তখন বেআইনি হোটেলের দিকটা দেখা যাবে ভুঁইঞা আর সৌভিক দুজনে কাজ আধাআধি ভাগ করে লিস্ট ধরে পাইস হোটেলদের ফোন করা শুরু করলো কানাই প্রথম দিকে শুধু সিগারেট খাচ্ছি্লেন আর ভুঁইঞার টেবিলের উপর থাকা পেপারওয়েট ঘোরাচ্ছিলেন পরে দুই অধস্তনের কাজের দ্রুততা দেখে বুঝলেন এইভাবে চললে তিনচার ঘন্টা লেগে যাবে সব হোটেলে খবর নিতে কানাই নিজের মোবাইল থেকে লিস্টের নিচের দিকে থাকা হোটেলগুলিতে ফোন করা শুরু করলেন
ছটা চল্লিশে কানাই যে খবর আশা করছিলে তা পেয়ে গেলেন ভুঁইঞা জানালো-হেদুয়ার একটি পাইস হোটেল বলছে লাস্ট কয়েকদিন ধরে খুব নুনদানি চুরি হচ্ছে
কানাই আর অপেক্ষা করলেন না ভুঁইঞা ফোর্স নিতে বলছিল, কিন্তু কানাই মানা করে দিলেনভুঁইঞাকে উর্দি পাল্টে সিভিল ড্রেসে আসতে বললেন থানার পাশেই ভুঁইঞার কোয়ার্টার, ভুঁইঞা উড়তে উড়তে গিয়ে জামাকাপড় পালটে উড়তে উড়তেই ফিরে এলো কানাই, সৌভিক আর ভুঁইঞাকে নিয়ে কোয়ালিস এবার চললো হেদুয়ার দিকে
হেদুয়ার পার্ল রেস্টুরান্টের মালিক শ্যামল কানুনগো এই অঞ্চলের অন্যান্য পাইস হোটেলের তুলনায় পার্ল রেস্টুরান্ট বেশ হাল আমলের দেওয়ালে রঙিল টাইলস বসানো, নীল রঙের পার্টিশান খাওয়ার ঘর আর রান্নাঘরকে আলাদা করেছে হোটেলের সামনে সরু গলি কানাইদের গাড়ি সাতটা দশে পার্লের সামনে এসে থামলো আকাশে বজ্রগর্ভ মেঘ থেকে তখন সবে দু একটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছেশহরের গরম ভাবটা কেটে যাচ্ছে
পার্লের মালিক শ্যামল কানুনগো ধূপধুনো দেখিয়ে ক্যাশবাক্স খুলছিলেন কানাইদের দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি পুজোর পাটটা সেরে নিলেন ভুঁইঞা্র ফোন পেয়েই তিনি আন্দাজ করেছিলেন সন্ধেটা ভালো কাটবার নয় নিচু গলায় ভুঁইঞা জানতে চাইলো-কর্মচারিদের বলেননি তো কানুনগোসাহেব?
শ্যামল কাকুনগোর পাকানো চেহারা, ছিটের জামা, দরজি দিয়ে বানানো প্যান্টচশমার উপর দিকে তাকিয়ে শ্যামল কানুনগো মাথা নাড়লেন
কানাই বললো-কোন জায়গায় বসলে, এই খাওয়ার জায়গাটা গোটাটা দেখা যাবে বলুন তো?
শ্যামল কানুনগো বললো-যে কোন একটা টেবিলে বসে পড়ুন, আজ তো একেই বৃষ্টি, কপাল মন্দ
-না না, খাওয়ার ঘরে না, একটু দূরে, রান্নাঘরে বসা যায়?
-আপনারা মালিক, যেখানে খুশি বসুন, রান্নাঘরে বসুন, গলির ওদিকে বোসেদের রোয়াকে হাত পা ছড়িয়ে বসুন, পার্টিশান নামিয়ে দিচ্ছি, সব দেখতে পাবেন
ভুঁইঞা আর সৌভিক গিয়ে বোসেদের রোয়াকে রুমাল পেতে বসলো কানাই ঢুকলেন রান্নাঘরে শ্যামল কানুনগো কানাইকে দেখিয়ে বটঠাকুরকে বলে গেল-দেশ থেকে এসেছে, আমাদের জ্ঞাতি, হোটেলের কাজকর্ম দেখবার শখ দাদার চা খাইয়ো ঠাকুর
কানাই একটি মুরগির ডিমের পরিত্যক্ত ক্রেট টেনে তার উপর বাবু হয়ে বসলেন, যতটা আরাম করে বসা যায় আর কি! ব্যাচ শুরু হওয়ার আগে বটঠাকুর এক কাপ চা আর সুজি বিস্কুট দিয়ে গেল আটটা থেকে লোকজনের আনাগোনা শুরু হলো আর সাড়ে আটটা থেকে বৃষ্টি নটার পর থেকে হোটেলে যেসব খদ্দের আসা শুরু করলো তাদের সবার মাথায় ছাতা আর সবাই খেয়ে খাতায় নাম সই করে যাচ্ছে সাড়ে নটার দিকে বৃষ্টি ধরে এলো তখন হোটেলে ভিড় অল্প বাড়লো কানাই বৃষ্টি  ধরে আসার ফাঁকে বারকয়েক বেরিয়ে ধুমপান করে এসেছেনসৌভিক আর ভুঁইঞার মশার অত্যাচারে পাগল হবার যোগাড় সাড়ে দশটার সময় শ্যামল কানুনগো রান্নাঘরে এসে জানালো-এই শেষ ব্যাচ!
ব্যাচে চার পাঁচটে টেবিলে লোক বসেছে ডাল ভাত দেওয়া হয়েছে, সঙ্গে আলুভাজা বটঠাকুর কানাই এর সঙ্গে দেশের গল্প করছিল কানাইও বাঁকুড়ার কোন কাল্পনিক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলকে নিজের দেশ ভেবে কথা বানিয়ে যাচ্ছিল সার্ভার এসে বললো-তিন নম্বরে একটা ছানার কালিয়া
বটঠাকুর-ওরে বাবা, সে তো আবার বানাতে হবে, বল গে দশটা মিনিট, দিচ্ছে
বটঠাকুর গল্প ছেড়ে উঠছিলেনকানাই জিজ্ঞেস করলেন- ফুরিয়ে গেছে নাকি ঠাকুর?
-ওই তলানি আছে, ইস্পেশাল, অল্প করে বানাই!
কানাই ডিমের ক্রেট থেকে লাফিয়ে উঠলেন, সার্ভারকে ডেকে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন-কোন টেবিল স্পেশাল অর্ডার করেছে?
ছেলেটি তিন নম্বর বলে হাত তুলে দেখালো পার্ল রেস্টুরান্টের এককোণের টেবিল এক জন মাত্র লোক দেওয়ালের দিকে মুখ করে বসে আছে কিছুক্ষণ আগেও এই টেবিলে দুজনকে একসঙ্গে খেতে দেখে কানাই কোন সন্দেহ করেননি আরেকটি লোক বোধহয় আগের ব্যাচের ছিল কানাই ধীর পায়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে খাওয়ার ঘরে ঢুকলেন কানাই-এর ধারনা হল, রোয়াক থেকে সৌভিক নির্ঘাৎ তাকে খাওয়ার ঘরে ঢুকতে দেখে থাকবে কানাই চুল আঁচড়ানোর ভঙ্গি করে, সৌভিককে ইশারা করলেন-আসতে হবে নাতিন নম্বর টেবিলের কাছে গিয়ে লোকটির ঘাড়ের উপর দিয়ে উঁকি দিয়ে কানাই দেখলেন ছেলেটি ডালে-ভাতে মেখে খাচ্ছে, একপাশে আলুভাজা আর টেবিলের উল্টোদিকে আগের লোকের ফেলে যাওয়া এঁটো বাসন, এখনও পরিষ্কার হয়নি কানাই নিশ্চিত হলেন, অবশ্যই এই ছেলেটি এই ব্যাচেই বসেছে, আর উল্টোদিকের লোকটি আগের ব্যাচের ছিল, যার খাওয়া গড়িয়েছিল পরের ব্যাচ অবধি
কানাই উল্টোদিকের চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়লেন ছেলেটি মুখ তুলে তাকালো না, খেতে থাকলো একমনে কানাই টেবিলের দিকে আড়াআড়ি তাকালেন টেবিলের উপর কনুই তুলে বসে একমুহূর্ত ছেলেটিকে খেয়াল করার চেষ্টা করলেন বয়েস কুড়ি একুশ, চোখের নিচে কালো দাগ, জামাকাপড় দেখে মনে হয় আর্থিক অনটন নেই কানাই দেওয়ালের গায়ে ঠেকানো জলের জগটি হাত দিয়ে সরিয়ে দিতেই বেরিয়ে পড়লো একটি নুনদানি, যা অবশ্যই অন্যান্য টেবিলের গুটিকয় নুনদানিগুলি থেকে আলাদা ছেলেটি আচমকা উঠে পড়লো, খাওয়া শেষ না করেই, যেন খুব বিরক্ত হয়েছে কানাই ডেকে বললো-ও ভাই এই যে আপনার নুনদানিটা, আপনারই তো?
ছেলেটা থমকে দাঁড়ালো, আবার কানাই এর টেবিলের কাছে ফিরে এসে কানাই এর হাত থেকে এক ঝটকায় নুনদানিটা নিতে যাওয়ার চেষ্টা করতেই কানাই খপ করে ছেলেটার হাত ধরে ফেললেন
কানাই ভেবেছিলেন ছেলেটি পালানোর চেষ্টা করবে
ছেলেটি পালানোর চেষ্টা করলো না চুপচাপ কানাই এর উল্টোদিকে নিজের খালি চেয়ারে বসে পড়লো
কানাইচরণ বললেন-স্পেশাল আসছে, খেয়ে নাও
ছেলেটি ডালভাতের মধ্যে আঙুল চালাতে চালাতে বললো-আপনি পুলিশের লোক, না? আমাকে ধরবেন?
কানাই বললেন-ধরে হবেটা কী! তুমি তো মরতেই চাও, আজ না হয় তিন বছর মামলা চলার পর
ছেলেটি মাথা নিচু করে থাকলো রান্নাঘর থেকে সার্ভার এসে ছানার কালিয়ার বাটি রেখে দিল কানাই ছানার কালিয়ার বাটির উপর নুনদানি উপুড় করে দিলেন নুনদানি থেকে নুনের বদলে এলুমিনিয়াম ফসফাইডের কালো দানা ছানার কালিয়ার বাটিতে মিশে গেল
কানাই জিজ্ঞেস করলেন-ভাত আর দেবে?
ছেলেটি মাথা নাড়লো ডাল মাখা ভাত সরিয়ে, থালার মুক্তোর মত সাদা ভাত আলাদা করে তাতে বাটি থেকে ছানার ডালনা পুরোটা ঢাললো
গোয়েন্দা কানাইচরণ ছেলেটির হাতের মুঠো ধরেছিলেন, ছেড়ে দিয়ে বললেন-আমরা নাম ঠিকানা জোগাড় করে বাড়িতে খবর দিয়ে দেব সুইসাইড নোটটা খুঁজলে পাবো তো?
ছানার কালিয়ায় মাখা ভাতের দিকে ছেলেটি মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো






2 comments:

  1. ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা ... অন্তরের অতৃপ্তিটা রয়েই গেল ...

    ReplyDelete
  2. Gota golpo ekdom athar Moto sete gechhilam ... End ta o non ending .. . Highly satisfied ��

    ReplyDelete

বাইশ গজের খাতা

Powered by Blogger.

Total Pageviews

যোগাযোগ করুন

Name

Email *

Message *

লেখা পাঠাবার ঠিকানা

আপনাদের ছোটো বা বড় গল্প পাঠান । বিশেষ করে সেই লেখাটি যা কেউ পড়বেনা ভেবে পাঠাননি আগে কোথাও। লেখা পাঠাবার ঠিকানা-mackerelblogzine@gmail.com

*[ লেখা বেছে নেবার ক্ষেত্রে সম্পাদকের রায় চুড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে । ]

Copyright © ম্যাকারেল | Powered by Blogger
Design by SimpleWpThemes | Blogger Theme by NewBloggerThemes.com | Distributed By Blogger Templates20