![]() |
| অলংকরণঃ সম্বিত বসু |
এখানে সীমানার পাশে দড়ি নেই কোনো। নেই কাঁটাতার। বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকে না সীমান্তরক্ষী। এখানে সীমানা মানে ধুলো-কাটা সাইকেল চাকার দাগ। এই আমাদের ঊষার মাঠ। মাঠে এসে সাইকেল নিয়ে পাক মারে সবাই। একসাথে, পাশাপাশি। গোল করে ঘুরে আসে মাঠ। ওই চাকার গোল দাগ বাউন্ডারি হয়ে যায়। শুরু হয় ক্রিকেটম্যাচ।
সেদিনের মতো খেলা শেষ। বাউন্ডারি লাইনের ওপর আমরা দাঁড়িয়ে। একপাশে ডান-পা অন্যপাশে বাঁ-পা। কথা হচ্ছিল দেশভাগ নিয়ে। একটা মাত্র দাগের অন্যধারে পা রাখতে হলে কত রকম হুজ্জুত করতে হয় আজকাল! বলছিল রাজাদা। রাজাদার জন্ম এ-দেশে হলেও সাত বছরে চলে গিয়েছিল পৈতৃক ভিটেতে। বাংলাদেশে। আবার সতেরো বছরে বাবার হাত ধরে কলকাতায়। বলতে বলতে, ডানহাতের ভাঙা মধ্যমা আর তর্জনীর মাঝে একটা সিগারেট ধরিয়ে স্মৃতির গোড়ায় খানিক ধোঁয়া দেয় রাজাদা।
বাংলাদেশে নাকি সেইসময় নাগরিকত্ব ছাড়াই মিলত রেশন। শুধু গিয়ে দোকানে দাঁড়ালেই পুরো পরিবারের রেশন তাকে দেওয়া হ’ত। রাজাদার দাদু বলেছিলেন, “যতদিন আমার শিরদাঁড়া আমারই পিঠে আছে, ততদিন কাউকে খাওয়া-পরা নিয়ে ভাবতে হবে না। কিন্তু একদিন এই শিরদাঁড়া পিঠ থেকে লাঠিতে নামবে। তারপর মাটিতে। সেদিন তোদের আসল পরীক্ষা।” কালচক্রে দাদু একদিন সত্যিই মাটির সঙ্গে মিশে গেলেন। পাঁউরুটি ছেঁড়ার মতো নির্লিপ্তভাবে টুকরো করা হ’ল জমিজমা। সম্পত্তি ভাগ হ’ল নিয়মমাফিক। নিয়মের ফাঁক গলে রাজাদার ভাগে পড়ল, শুধু দাদুর বলে যাওয়া কথাগুলো। স্মৃতিকে স্কুলব্যাগে ভরে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এলো রাজাদা। ভালোবাসলো অন্য ধর্মের মেয়েকে। জন্মদাগের পাশে উল্কি দিয়ে লিখল নাম। শুধু সেই নামটুকু বাদে বাকি সবই মুছে-ধুয়ে গেল ঝড়-জলে। আপন হ’ল এই ভারতীয় আবহাওয়া। দূরে দূরে ভেসে গেল পরিবার পরিজন। হিন্দু ছেলে, চামড়ায় মুসলমান মেয়ের নাম; ভোটার কার্ডে ধ্যাবড়ানো কালোতে লেখা: রাজা মালাকার।
ব্যাট ধরার কায়দা দেখলে মনে হবে, ব্যাট নয়, কোদাল ধরেছে। পা নড়ে না, সামনে এগোয় না, পিছনে সরে না। শুধু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কোমরের দুলুনি। পায়ে টাইট করে বাঁধা সাদা কেডস্। আউট হলে বুঝতে পারে না। বুঝতে পারলে মানতে চায় না। ফিল্ডিং-এর সময় বল ডানহাতে ধরবে না বামহাতে তা বুঝতে বুঝতেই বল গলে চার। রাজাদার ক্রিকেট এরকমই। সারাক্ষণই অনিশ্চয়তায় ভোগে। ভারত-বাংলাদেশ খেলা হ’লে কার হয়ে গলা ফাটাবে সেই নিয়ে চিন্তায় পড়ে যায়। স্বাধীনতার পক্ষে নাকি দেশভাগের বিপক্ষে যাবে এই নিয়ে দোটানা। কোনটা তার দেশ? যে দেশের মাটিতে লেগে আছে দাদুর অস্থি-মজ্জা-ছাই? নাকি যে-দেশে তার ভাঙা মধ্যমা চেপে ধরে একরত্তি মেয়েটা ‘বাবা’ বলে ডেকেছে, সেই তার দেশ?
মফঃস্বল ফুটো করে শহরের হাওয়াবাতাস ঢুকে পড়ছে এখানেও। এমনই রাতারাতি মাঠ ফুঁড়ে বহুতল উঠে যাচ্ছে, মনে হতে পারে আলাদিনের সেই দৈত্য সত্যিই আছে হয়তবা। এরকমই আচমকা উঠে যাওয়া এক বহুতলে কেয়ারটেকারের চাকরি নিয়ে রাজাদা এখন এ-পাড়ার বাসিন্দা। বিল্ডিং-এর একতলায় গ্যারেজ। গ্যারেজের পাশে সিঁড়িঘর। তিনজন প্রাণী। বউবাচ্চাসমেত রাজাদা। শৈশব না পেরনো মানুষেরা একেই রাজার বাড়ি ব’লে চেনে। রাত্রে সকলে যখন ঘুমিয়ে তখন একা জেগে পাহারা দেয় রাজাদা। সন্দেহজনক শব্দ শুনলেই ইশারা দেয় বিড়াল-কুকুরকে। রাতে পাহারা, সকালে ক্রিকেট মিলিয়ে রাজাদা। আমরা ইয়ার্কি ক’রে বলি, “রাজার তো কাজই মানুষকে রক্ষা করা। তুমিও তাই করছ।” ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের চাঁদার টাকায় রাজাদার মাইনে হয়। আমরা বলি, “রাজকর”। ওর পকেটে রাখা দেশলাইবাক্সকে বলি, “আগ্নেয়াস্ত্র”।
গণতন্ত্রের দেশ রাজার নিয়ম মেনে নেয়নি। প্রোমটারের কাছে নালিশ জানিয়েছেন বাসিন্দারা। অভিযোগ– তাদের হুকুমের জন্য হাঁ করে বসে না থেকে, রাজাদা সামনের গলিতে ক্রিকেট খেলতে চলে যায়। ভাবতে অবাক লাগে; পেটো নয়, হাতবোমা নয়, শুধুমাত্র কালো পিচরাস্তার ওপর ক্রিকেটবল ছোঁড়া দেখলেও মানুষ কতটা শঙ্কিত হয়ে পড়ে। ডানহাতের সেই বাঁকা মধ্যমার চাপ খেয়ে ছুটে আসা বল কখন ইনসুইং হবে কখনই বা আউটসুইং তা আমরা আজো বুঝিনি। বাসিন্দারা ওই অবাধ্য ডেলিভারিগুলোকে ভয় পান। ভয় পান ওই বাঁকা মধ্যমাকে। যে চিরকাল বাঁকাই থাকবে। সোজা কথায় আদেশ পালন করবে না। প্রতিবাদ করবে। একই গ্রিপ। একই বোলিং অ্যাকশান। একই জায়গায় পড়বে। অথচ, একটা বল বাইরে যাবে, আরেকটা ভিতরে। আর হাওয়াবাতাসের রন্ধ্রে ছড়িয়ে দেবে সেই অমোঘ ভয়। একই পরিবেশ, একই গায়ের রঙ, একই নদীর জল। তবু ভিতরে থাকলে ভারত, আর বাইরে গেলেই বাংলাদেশ? প্রশ্ন তুলবে, হিন্দুর ছেলের পক্ষে। উত্তর চাইবে তার প্রথম প্রেম মুসলমান মেয়েটির হয়ে।
তবে কি সময় আমাদের রক্তচলাচলের মধ্যে সিরিঞ্জে করে ঢুকিয়ে দিচ্ছে আতঙ্ক? সমস্ত শ্যাওলা-জমা নিয়মের বিরুদ্ধে যে প্রশ্ন তুলবে তাকেই দমিয়ে দেওয়া হবে? নাকি আতঙ্ক আসলে সৎ উচ্চারণের গায়ে আঠা দিয়ে লাগানো থাকে? ন্যায্য কথা বললেই কেঁপে ওঠে কড়া শাসনের ঘরবাড়ি। ব্লগার হত্যা বেড়ে যায়। শিক্ষকহত্যার ফাইল ধুলোর মধ্যে ধুলো হয়ে যায়। জেলের ভিতর লাশ সেজে শুয়ে পড়ে মানুষ চিরকালের মতো। আর প্রোমোটারের নির্দেশে আচমকা বন্ধ হয়ে যায় এক কেয়ারটেকারের ক্রিকেট খেলা।
মনে পড়ে, তখন আমরা স্কুলে পড়ি। সাল দুহাজার-এক। ভারতে খেলতে এসেছিল স্টিভ ওয়ার অস্ট্রেলিয়া। সারা ক্রিকেটবিশ্ব তখন শাসক বলতে ওই একজনকেই চেনে। যার ঔদ্ধত্বের রঙ ব্যাগি গ্রিন। যার জিভ গোলাপি ছুরি। উদ্দেশ্য বিপক্ষকে অপমান দিয়ে কোপানো। সিরিজ জিতে, স্টাম্প হাতে মাঠ ছাড়ার ভঙ্গিমা দেখলে মনে হবে রাজদণ্ড হাতে কোনো এক অবিংসবাদী সম্রাট। স্টিভ মাঠে টস করতে নামলে, বিপক্ষ অধিনায়ক আগে থেকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবেন। এমন এক না-লেখা নিয়ম তখন ক্রিকেটে। খেলার সময়ও তার শীতল চোখের দিকে চোখ তুলে দেখবে না কেউ। কথা হবে মাথা নামিয়ে। নইলে তাকে স্লেজিংব্লেডে কচুকাটা করে ফেলবে অজিরা। আর স্টিভও আসবেন, দেখবেন, জয় করবেন। অথচ, তখন এপ্রিল মাসের গরম। ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া তৃতীয় ওয়ানডে। মাঠে বিপক্ষ ক্যাপ্টেনের জন্য অপেক্ষা করছেন স্বয়ং স্টিভ। চোখেমুখে বিরক্তি-রাগ। গরমে তাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে এত সাহস কোনো কালো চামড়ার অধিনায়কের হতে পারে তা যেন অবিশ্বাস্য ঠেকছে! অবাক হয়ে ভাইজ্যাকের মাঠ দেখছে উলটে যাচ্ছে চিত্রনাট্য। অনেক দেরিতে ভারতীয় ড্রেসিংরুম থেকে বেরোলেন জনগণমন অধিনায়ক সৌরভ। পিছনে গ্যালারি। সামনে স্টিভ। এগিয়ে আসছেন আমাদের অধিনায়ক, টুপিতে অশোকচক্র। বাদামী ক্যাপ্টেন হেঁটে আসছেন বর্ণবিদ্বেষ ভেদ করে। বাইরে বিশাল পাহাড়ের গ্যালারি। শিখিয়ে যাচ্ছে, কীভাবে শাসকের সামনে প্রতিরোধ হয়ে দাঁড়াতে হয়।
সেই ছিল শুরু। শাসকের দিকে আঙুল তোলার। একে একে আঙুল উঠল ভারতীয় ক্রিকেটে ক্যান্সার হয়ে থাকা প্রাদেশিকতার দিকে, বর্ণবিদ্বেষের দিকে, প্লেয়ার্স কোটার দিকে। স্কোরবোর্ড আমাদের দেখাত ভারত বনাম সাউথ আফ্রিকা, ভারত বনাম ইংল্যাণ্ড ইত্যাদি। অথচ সৌরভ বনাম কর্মকর্তা, সৌরভ বনাম ক্রিকেটবোর্ড, সৌরভ বনাম আইসিসি এই সব লড়াইয়ের উল্লেখ থাকত না কোথাও। আমাদের শৈশব সেই থেকে নীরব থেকে সরবের দিকে চলে গিয়েছিল। যার খেসারত হিসেবে আমরা দেখতাম একের পর এক ম্যাচে সৌরভের ম্যাচ-ফি কাটা যাচ্ছে। শুধু বদলে যাচ্ছে প্রতিপক্ষের নাম, ম্যাচ রেফারির নাম, স্কোরবোর্ডে লেখা রান। শাসকের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্যই তার ক্রিকেট কেরিয়ার অকালে ঝরে গেল কিনা সেই নিয়ে তর্ক চলবে আজীবন।
আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তর্ক করে রাজাদা। যে কোনো বিষয় হোক, রাজাদা তর্কশাস্ত্রে প্রায় চাণক্য। রাজাদার বাড়ি আর পাড়ার মুদির দোকানের মাঝ দিয়ে একখানা গলি। দুপাশের পাঁচিল মার্জিন হয়ে আরো সরু করে দিয়েছে তাকে। কোনো বড়ো গাড়ি সেখান দিয়ে ঢোকানো নিষেধ। অথচ সেইপথে বড়ো এক জিপ রোজই ঢুকে পড়ে। বড়োলোক বাড়ির ড্রাইভার। কেউই খুব কিছু বুলে না। শুধু ছুটে গিয়েছিল রাজাদা। গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভারকে বলেছিল, “এত তেল যে বাঁচাও, তাও কি মালিকের মাথায় মাখাবে? ঘুরে আসতে কী হয়?” সেই থেকে শুরু হয় তক্কাতক্কি। স্বয়ং মালিক এসে রাজাদাকে বলে, “তোমার কাছ থেকে এত কথা কেন শুনব? তুমি তো এ-পাড়ার বাসিন্দা নও।” তারপর থেকেই বন্ধ হয়ে যায় রাজাদার খেলা। সকালে ব্যাটের বদলে ছুরি হাতে গ্যারেজে বসে থাকে। ছুরি হাতে মানুষের হিংসার কথা ভাবে। সবজি কাটতে কাটতে ভাবে, কীভাবে কেটে ভাগ হয়ে গিয়েছিল দাদুর জমিজমা, কেমন করে কাঁটাতার ফেলে মানচিত্রে ভাগ করা হয়েছিল দুই বাংলা, কেন পাড়ার বাসিন্দাদের পাহারাদার নিজে সে পাড়ার বাসিন্দা হতে পারেনি। ঠোঁটের কোনায় ঝুলে থাকে শ্লেষ মাখানো হাসি। শ্লেষের ফাঁক দিয়ে বিড়ির ধোঁয়া ইনসুইং আউটসুইং হতে হতে মিলিয়ে যায় বাতাসে।
রাজাদাকে কখনও জিজ্ঞেস করা হয়নি রাজাদা সত্যিই এইসব ভেবেই হাসে কিনা! রাজাদার ভোটার কার্ড আছে। অর্থাৎ, সে ভারতের নাগরিক। তবু সে বাসিন্দা নয়। বাসিন্দা না হওয়ার জন্য ক্রিকেট খেলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে তার থেকে। একজন মানুষ, যার আত্মীয়রা কেড়ে নিয়েছে বাবার জন্মস্থান। রাষ্ট্র কেড়ে নিয়েছে প্রথম প্রেম। পাড়ার লোক কেড়ে নিয়েছে খেলা। সে শুধু জানে তার এই জীবনও একদিন লাঠি বেয়ে মাটিতে নামবে, সেইদিন এই নিরপেক্ষ দেশের মাটি গ্রহণ করবে তো তার বিদেশি নাগরিককে? নাকি ততদিনে দুই দেশের সম্পর্ক এমন হয়ে যাবে, যে ক্রিকেট মাঠের বাউন্ডারিতেও বন্ধুকধারীরা পাহারায় বসবে? বসবে কাঁটাতার। দূরের গ্যলারিতে বসা দর্শক দুরবীনের বদলে বন্দুকনলের ভিতর দিয়ে ক্রিকেট দেখার চেষ্টা করবে হয়ত!

No comments:
Post a Comment