১
মধ্যরাতের শীতল নিথর কুয়াশাজাল ছিন্ন করে ভেসে এল এক
মহিলা কন্ঠের সুতীক্ষ্ণ চিৎকার, ইইইইইই…। অসংখ্য হীরক-কুচির মতো
তারাভরা আকাশের এককোনে অসাধারণ জোৎস্না-সজ্জিত চাঁদ থাকা সত্ত্বেও
সামনের বিশাল ঝোপ-ঝার-জলা- জঙ্গলময় প্রান্তরের ইতিউতি চাপচাপ অন্ধকার জমে আছে। টুপি-মাফলারের ফাঁক দিয়ে ঘাড়ের একটা উন্মুক্ত অংশে মাঝে-মাঝে
হাওয়া লেগে শিড়শিড় করে উঠছে। কুয়াশাবৃত ঝোপঝাড় ঠেলে তাড়াহুড় করে মহিলা কন্ঠ কে তাক
করে এগোতে গিয়ে হ্যাচোর-প্যাচোর করে পড়ে গেলাম একটা জলা জমির
মধ্যে। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আবার পা পিছলে গেল। জল তেমন গভীর নয়, কয়েকবারের চেষ্টায় উঠে দাঁড়িয়ে দেখলাম কোমড় অবধি হবে। তবে ঠান্ডাটা গোটা
গায়েই কাঁটার মতো বিঁধছে, যেন ভুল করে আদরে শজারু জাপ্টেছি।
মাথায় অক্সিজেনটাও মনে হয় কম যাচ্ছে, বড় বড় শ্বাস পড়ছে। জলের
নিচ থেকে বড় বড় ঘাসের মাথা উঁচিয়ে আছে, শক্ত মুঠোয় সেগুলোকে
আঁকড়ে আঁকড়েই এগোতে থাকলাম। বেশিদূর না, আস্তে আস্তে জলের
গভীরতা কমছে টের পাচ্ছি। অবশেষে শুকনো জমিতে উঠে একটু দাঁড়ালাম। গোছানোর দরকার।
জুতো-মোজা-জামা-প্যান্ট-সোয়েটার সব জল-কাদায় মাখামাখি। বিস্তীর্ণ প্রান্তর বেয়ে
বাঁধভাঙ্গা হাওয়া বইছে। ছিঁড়ে পড়ার আগের মুহুর্তের শুকনো পাতার মতো তিরতির করে
কাঁপতে কাঁপতে মনে পড়লো প্যান্টের পেছনের পকেটে একটু রাম আছে। সেটার খোঁজে হাত
বাড়াচ্ছি, আবার এল চিৎকারটা, ইইইইইই...।
ঠান্ডা-গরম-মদ সব ভুলে ঝট করে তাকালাম বাঁদিকে। আমার সজাগ কান, সহজে ভুল হয় না। বেশ খানিকটা দূরে জঙ্গলের মধ্যে একটা বাড়ির মতো মনে হল,
ছায়া-ছায়া গাছপালার মধ্যে একটা অন্যরকমের ছায়া। একটা কাঁপা কাঁপা
টিমটিমে আলোও জ্বলছে যেন। ছুটলাম সেদিকে। ছুটছি ছুটছি। থামলাম। কিছু একটা দলা
পাকিয়ে আছে। ছুটে যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি --- এরকম একটা দলা।
আবার ঠান্ডাটা ফিরে আসছে। নাঃ, এসব দ্বন্দ্ব-দোলাচলতাকে
প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না। ভালোও লাগে না। সঙ্গে আবার উদ্বেগ-রোধক বড়ি-গুলোও নেই।
মাথার ওপরে একটা পেঁচা ডেকে উঠলো, আমিও ফের ছুটতে শুরু করবো,
আর চোখে পড়ে গেল কমোডটা। হ্যাঁ কমোডই, মানে ঐ
চেয়ারের মতো আরাম করে চেপে বসে যেখানে হাগা যায়। আমার সুতীব্র নজরে সহজে ভুল হয়
না। জোৎস্নার আলোতে চকচক করছে। প্রায় প্রমান মাপের চতুস্তল বাড়ির সমান উঁচু। ওপরের
ঢাকনা, পেছনের জলাধার --- সবই আছে। যদি কোনো শিল্পসৃষ্টি হয়ে
থাকে তবে স্রষ্টা বেশ উঁচুদরের, বলতেই হবে। হাসি পেয়ে গেল,
কী পরিহাস --- জঙ্গল, যেখানে খুশি যখন তখন বসে
পড়, পাতা দিয়ে মুছে নাও, সেখানে একটা
পেল্লাই মাপের কমোড! আমার সাথে দড়ি-ক্ল্যাম্প সব আছে। চারতলা মতো খাড়াই চড়া আর কী
এমন ব্যাপার! আমি তিন মাস ধরে এভারেস্টে চড়ার জন্য শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর কসরত
করেছি মাত্র ছ’মাস আগেই। একটু ঝোলাঝুলি করতে হল বটে কিন্তু
তাও বেশ হাল্কাভাবেই ঊঠে এলাম কমোডের কিনারায়। সাবধানে তাকালাম অন্তর্ভাগে। হাসি
পেল আবার। ধারণা হয়েছিল কমোডের মাপের সামঞ্জস্যপূর্ণ মলখন্ডও ভেসে থাকবে হয়তো
পুকুরের মতো কোনো জলভাগের ওপর। সে গুড়ে বালি --- আক্ষরিক বালিই জমে আছে অনেক নিচে।
সাদা ঝকঝকে পরিষ্কার বালি। শ্বাপদের ন্যায় সপ্রাণ ষষ্ঠেন্দ্রীয় বলছে, আমি একা নই। আমার বেড়াল-চোখের গোলক চঞ্চল হয়ে উঠল। হঠাৎ কমোডের সাদা
বালিতে মনে হল আলোড়ন উঠছে, পুকুরের জলে ঢিল ফেললে যে
তরঙ্গ-প্রভাব, সেরকম। ক্রমে সেই বালি-তরঙ্গ ছাপিয়ে উঠে এল
পরিচিত মহিলা কন্ঠের চিৎকার, ইইইইই...। সেই তরঙ্গাভিঘাত
হামলে পড়ল আমার কর্ণকুহরে। ফোঁটা থেকে ধারা হয়ে রক্ত নেমে এল। দুহাতে কান চেপে উবু
হয়ে বসে পড়লাম, কমোডের নিচভাগটা এগিয়ে আসছে। পড়ে যাচ্ছি?
না, দাঁড়িয়েই আছি, দুলছি।
পড়েই যাব হয়তো। কমোডের তলাটা এগিয়ে আসছে, আসছে, আসছে, আসছে --- পৌঁছচ্ছে না। আসছে, আসছে --- ক্রমশঃ। চারিদিকে পিন পতন নীরবতা।
২
ট্রেনটা এমনিতেই মনে হয় ঘন্টাখানেক পিছিয়ে চলছে, অনেকখন হল রঙ্গিয়া জংশন ছেড়ে এসেছে, এখন আবার কোথায় দাঁড়ালো কে জানে! আর ইদানীং দেখছি ট্রেন দাঁড়ালেই ঘুম
ভেঙ্গে যাচ্ছে। খানিক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে বিরক্তি ধরে গেল। কোত্থেকে এই বাতানুকুল
কামড়াতেও একটা নচ্ছাড় মশা এসে ঢুকেছে, সমানে কানের একটা
নির্দিষ্ট জায়গায় কামড়ে যাচ্ছে, ফিরে ফিরে এসে। কুপের বাকি
পাঁচজন বা সাইড সিটের দুজনের ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়া নিয়ে কোনো বিকার নেই। নিচের
মারোয়ারিটাতো সেই আলিপুরদুয়ারেই গাদা টিফিনবক্স ফাঁকা করে, নাকের
নিচ অব্ধি ঢেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝেই নানা প্রকারের দুর্গন্ধ ভেসে আসছে,
আমার সন্দেহ ওর দিকেই। বাতানুকূল কামড়ার এই সবচে’ বড় সমস্যা --- বিরিয়ানি হোক আর বাতকর্মই হোক, গন্ধটা
থেকেই যায়। আশপাশেই কেউ একজন নাকডাকার নামে কামান দাগছেন। এই উদ্ভট নির্বাসনে আর
থাকা চলে না।
কম্বল টম্বল সরিয়ে নেমে এলাম নিচে। একেবারে ওপরের
বার্থ থেকে নামতে গেলে যদিও সবসময় একটা আশঙ্কা হয়, যদি কেউ উল্টোমুখে শোয়, নামতে
গিয়ে ভুল করে তার মুখ মাড়িয়ে দিই, আর খুলিটা ফেটে গেল ফটাশ
করে! এছাড়াও একটা অন্য কিন্তু-কিন্তু আছে, কম্বল রেল কোম্পানীর, লোটাটা আমার, যদি চুরি হয়! তবে এখন গোটা কামড়ায় যা নাক-ডাকার কলতান, তাতে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। মনটা বড্ড সিগারেট খাই খাই করছে।
দরজার সামনে একজন বন্দুকধারী পুলিশ দেখবো
ভেবেছিলাম, বদলে বাতানুকূল অঞ্চলের সরু কাচের
দরজাটা খুলে বাঁদিকে বেঁকতেই দেখি একটা অল্পবয়সী ছেলে আর মেয়ে জাপ্টে চুমু খাচ্ছে,
মেয়েটার জামার ভেতরে ছেলেটার হাত। প্রথমে আমায় দেখেনি, তারপর ঝট করে সরতে গিয়ে মেয়েটার জামায় টান-ফান পড়ে
হাস্যকর দশা। বাতানুকূল অঞ্চলের বাইরে এখানটায় ঠান্ডা ভালোই, দুজনেই হাফাচ্ছে, কপালে ঘামবিন্দু। ওদের আর বিব্রত
করব না ভেবেও মুচকি হাসিটা সামলানো গেল না। পাশ কাটিয়ে গিয়ে ঘটাং করে কামরার ভারি
লোহার দরজাটা খুললাম। বাইরের কনকনে হাওয়া ঝাপটা মারল মুখে।
নামের ফলকটা রঙ চটে প্রায় কিছুই পড়া যাচ্ছে না, বোধহয় পটলপুর বা পটাশপুর এরকম কিছু। প্ল্যাটফর্ম
বলতে ইঁট-সিমেন্ট দিয়ে বাধানো একটা ছোট্ট আয়তক্ষেত্র, ট্রেনটার
এক-তৃতীয়াংশও ধরেনি, ট্রেনের তল থেকে অনেকটা নিচুও। প্রায়
লাফিয়েই নামতে হল। সিগারেটটা ধরিয়ে একটা ভালো করে টান মারলাম। চা পেলে ভালো হত।
কিন্তু স্টেশনে, একপাশে সর্বাঙ্গ চাদর-মাফলারে মোড়া একজন
ঝাড়ুদার ছাড়া আর কেউ নেই। এই শীতের রাতে সে হঠাৎ ঝাঁড়ু দিচ্ছেই বা কেন, কে জানে!
গোটা স্টেশনে তিনটে টিমটিমে হলদে আলো জ্বলছে। আর
একটা আলো জ্বলা ঘর, বোধহয়
টিকিট কাউন্টার, আপাতত ফাঁকাই। আর দূরদূরান্ত অবধি কোনো আলোক
বিন্দুও নেই। মনে হচ্ছে এই ট্রেন আর স্টেশনটা ছাড়া পৃথিবীতে আর কিছুই নেই। হাঁটতে
হাঁটতে প্রায় ইঞ্জিনের কাছে চলে এসেছি। সামনের লাইনটা জমাট কুয়াশায় ঢাকা। একটু
সামনে লাল রঙের সিগনালের আলোটা কোনোমতে জানান দিচ্ছে যাওয়া যাবে না। আমিও আর না এগিয়ে পেছনের ফিরলাম।
ঝাড়ুদার লোকটাকে দেখছি না। সিগারেটটা শেষ, কিন্তু ট্রেনে উঠে পড়তে এখনি মন চাইছে না। আকাশের
দিকে তাকালাম, এখানে অনেকটা দেখা যায়। ঝকঝক করছে তারায়।
অনেকবার শুনেছি পৃথিবী থেকে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ দেখা যায়, কিন্তু
আমি দেখিনি, বা দেখলেও চিনতে পারিনি। আজও মনে হল এটাই
আকাশগঙ্গা, কিন্তু চিনবো কিভাবে?
- চা খাবেন?
ট্রেনের মৃদু গুনগুনানি আর আশপাশের কীতপতঙ্গের
আওয়াজ ছাড়া এতক্ষণ কোনো আওয়াজ ছিল না। হঠাৎ কানের কাছে একটা মানুষের গলার আওয়াজ
পেয়ে চমকে উঠেছিলাম।
- কফিও আছে।
দেখি সেই ঝাড়ুদার, হাতে লাঠিয়ালা ঝাঁটার বদলে এখন দুটো ঢাউস ফ্লাস্ক।
- তুমি ঝাড়্ দিচ্ছিলে না?
- হ্যাঁ স্যার।
মুখে একগাল হাসি, অন্ধকারে সাদা দাঁত ঝলকাচ্ছে।
- চা-কফিও বিক্রি কর?
- হ্যাঁ সার।
- কফি কত করে?
- শীতের রাত, দেবেন কুড়িটা টাকাই দেবেন।
- চিনি ছাড়া হবে?
- না চিনি ছাড়া তো...
- আচ্ছা যা আছে তাই দাও, শুধু কফি পাঊডারটা আর একটু দিও।
আমায় এককাপ কফি দিয়ে নিজের জন্যও এককাপ ধেলে নিল।
আমি আর একটা সিগারেট ধরালাম।
- একটা হবে?
হাত বাড়িয়েছে।
- সিগারেট?
লোকটা লাজুক হাসল, মাফলারের ফাঁক দিয়ে প্রথমবার ওর চোখদুটো দেখতে পেলাম,
টকটকে লাল। নেশা টেশা করেছে নিশ্চই। আমার সিগারেটের প্যাকেটটা থেকে
একটা নিয়ে, ধরিয়ে, চোখ বুজে একটা
আয়েশের টান মারলো।
- কদ্দূর চল্লেন স্যার?
- বদরপুর।
- কাজে?
- নাঃ বেড়াতে। ওখান
থেকে...
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই ঘটাং করে কামড়ায় অন্য
প্রান্তের দরজাটা খুলে গেল, একজন
মধ্য ত্রিশের সুদর্শন যুবক, বেশ লম্বা চওড়া, মোবাইলে উত্তেজিত হয়ে কথা বলতে বলতে নেমে এল...
- বেশি চালাকি করার
চেষ্টা কোরো না। এক হপ্তা আগে থেকে বলে আসছি...
হঠাৎ আমাদের দিকে চোখ পড়ায় থেমে গেল। গলাটা বেশ
কয়েকগ্রাম নিচে নেমে গেল।
- কাল বিকেলের মধ্যে
পৌঁছাব। যেটা বললাম মাথায় রেখো।
ফোনটা কেটে দিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন।
- একটা কফি।
সোজা একটা কুড়ি টাকার নোট বাড়িয়ে ধরেছেন, তারপর আমার দিকে তাকালেন,
- কখন ছাড়বে টাড়বে কিছু বলছে?
- না, মানে
কাউকে তো জিজ্ঞেস করিনি।
- আপনিই...
চোখ কুঁচকে, এরকম ভাবে তাকানোর ভাষাটা আমার পরিচিত।
- ...আপনি প্রজাপতি না?
- আপনি আমার লেখা পড়েছেন?
এবার একগাল প্রত্যাশিত হাসি,
- আরেঃ, আমার
বউ তো আপনার কবিতার খুব ভক্ত । আমি যদিও
কবিতা অত পড়ি না, তবে পূজোসংখ্যায়
যে উপন্যাসগুলো বেরোয়, সব আমার গিলে খাওয়া।
- ধন্যবাদ।
চা-কফিয়ালা কফি দিল ওঁকে। শব্দ করে চুমুক দিলেন।
- আলিপুরদুয়ারে এসেছিলেন নিশ্চই?
- হ্যাঁ, ওই...
- জানি জানি সাহিত্য সম্মেলন, আমিও আলিপুরেই ছিলাম এইকদিন, ভেবেওছিলাম একবার
ঢূঁ মারব, তারপর যা হয়, কাজের
চাপ।
- ইনিও বদরপুর যাবেন
স্যার।
সেই চা-কফিয়ালা এবার মুখ খুলল।
- কে? ও নীলু, তোকে কতবার
বলেছি স্যার স্যার করবি না...
ঠিক এইসময় ট্রেনের গুরুগম্ভীর ভোঁওওটা বেজে উঠল।
সিগনালের আলোটা সবুজ হয়েছে।
- চলুন ওঠা যাক...
চা-কফিয়ালাটা ফ্লাস্কদুটো হাতে নিয়ে পেছনের দিকে
দৌড়ালো। আমরা ট্রেনে ওঠার সাথে সাথে ছেড়ে দিল। উনি দরজাটা ভালো করে লাগালেন।
- বদরপুর যাচ্ছেন যখন, কাল সকালে ভালো করে আড্ডা মারা যাবে। এখন
শুয়ে পড়ুন।
আমাকে আর কিছু বলার সূযোগ না দিয়েই এগিয়ে গেলেন। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে
মুখে-চোখে-ঘাড়ে ভালো করে জল দিলাম, আয়নায় দেখলাম, মুখে গত ক’দিনের
ঘোরাঘুরির ছাপ পড়েছে।
বার্থে উঠে দেখলাম, নাঃ ব্যাগটা অক্ষতই আছে। আবার চাদর কম্বল টেনে শুলাম, হাল্কা দুলুনিতে ট্রেন চলছে। হঠাৎ মনে হল, লোকটার তো
নামই জানা হল না। চা-কফিয়ালার নাম জানি, নীলু। ওকে আবার ওই
ভদ্রলোক কিকরে যেন চেনেন। নীলু বললো ইনিও বদরপুর যাবেন? সবাই
যেন বদরপুরেই যাচ্ছে! এমনিতেই জানি না কাল কি হবে? এতবছর ধরে
দলাটা আটকে আছে, ভেবেছিলাম উগরে ফেলেছি। হুঃ, ঐ ভাবাটাই সার।
ব্যাগের সামনের চেনে আমার ওষুধের প্যাকেটটা থাকে, সেখান থেকে একটা ট্যাবলেট নিয়ে মুখে পুরলাম। জলের
বোতলটা কোথায় রেখেছি? টিমটিমে নীল আলোয় কিছুই ভালো করে ঠাহর করতে পারছি না। এই বোতলটা বোধহয়
মারোয়ারিটার। যাকগে, আপাতত
ওটা থেকেই কয়েক ঢোক মেরে দেওয়া যাক।
৩
- তোমার বন্ধু তো পুরষ্কার পেল।
- কে?
- কিছুই খবর রাখছো না। কবিতার স্ট্যান্ডার্ডও যা হচ্ছে...
- বাজে বকবেন না তো, কি বলতে ডেকেছেন সেটা বলুন।
- কাল তো সব কুম্ভমেলায় চললে,
- হাঃ হাঃ হাঃ, ভালো বলেছেন... আপনি যাবেন নাকি?
- মাথা খারাপ! কবি-লেখকদের আমি হেবি ভয় পাই, হাতের কাছে পেয়ে ছিঁড়ে খাক আর কি।\
- কে পুরষ্কার পেয়েছে বলছিলেন...
- হ্যাঁ, “বেমানান”,
পড়েছ?
- “বেমানান”?
- বললাম যে, পড়াশোনা ছেড়ে শুধুই পেজ থ্রী করে বেড়াচ্ছ। এবছরের সেরা উপন্যাস,
ওই তোমাদের সম্মেলনেই প্রাইজ দেবে।
- কোথায় বেড়িয়েছিল? কার লেখা?
- ওই উত্তরবঙ্গেরই একটা ছোটো পত্রিকায়। শিশিরবিন্দু না কি
একটা নাম। আমার কাছে আছে, নিও।
কিন্তু যেটা ইন্টারেস্টিং, সেটা হল লেখক। নাম দেওয়া আছে
নৃসিংহ সিংহরায়।
- নৃসিংহ সিংহরায়! আচ্ছা, আচ্ছা, ক’দিন এরকম একটা
নাম নিয়ে এফবিতে আলোচনা হচ্ছে দেখেছি...
- দাঁড়াও দাঁড়াও, এখানেই শেষ নয়। খুঁজতে গিয়ে দেখি, কেউ জানে না,
কে এই নৃসিংহ সিংহরায়।
- পুরষ্কার পাচ্ছে বললেন যে...
- হুমম্, কিন্তু
সেখানেও এক-দুজন ছাড়া কেউ জানে না। তবে,
- আপনার কাছে ঋণী এরকম লোকের তো কোথাও অভাব নেই, এই এক ডায়লগ মারতে আপনার একঘেয়ে লাগে না?
- হেঁঃ হেঁঃ, আরে শোনোই না, অনেক ফোন টোন মেরে শেষে জানলাম এ
হল সেই সাত্যকী।
- সাত্যকী?
- সাত্যকী রায়।
- স্যাটা?
- হুমম্।
- বলেন কি? কোথায়
আছে সে?
- বলব, বলব,
কিন্তু আগে বল তুমি কাজটা করবে কি না?
- কি কাজ?
- আমি এরকমই একজনকে খুঁজছিলাম পার্থ। সামনে স্পেশাল ইস্যু।
- হুম, ত্রিশ
বছর। কিন্তু,
- দেখ, যা
ঘটেছিল...দুর্ভাগ্যজনক, কিন্তু ওর লেখা নিয়ে তো প্রশ্ন
থাকতে পারে না।
- তা বলছি না, বুঝতে পারছেন না, ও কি এখন আর লেখে? মানে দুম করে...
- দুম করে না, এই লেখাটা পড়, বুঝতে পারবে।
- সে নাহয় হল, কিন্তু আমাদের এখানে লিখবে ও? রাজি হবে?
- তার জন্যেই তো তোমাকে বলছি। তোমাকে ফেরাবে না।
- বেশ, ঠিকানা
বলুন...
- কাজলদিঘি।
- কোথায়?!
৪
- এই যে রাস্তাটা দেখছেন, এটা ছিল ইন্ডিয়া, আর দুপাশে বাংলাদেশ।
- এখন তো সবটাই ইন্ডিয়া?
- হ্যাঁ, গেল
আশ্বিনে পতাকা ওড়ালাম...
- এখানে থানা কোনটা? নিলামবাজার?
- হ্যাঁ স্যার, তবে, শুনছি নতুন
থানা হবে।
অন্ধকার হয়ে গেছে, আশপাশে জনবসতি নেই বললেই চলে, জলা জঙ্গল মিলিয়ে
অদ্ভুত একটা জায়গা --- এরকম একটা জায়গা ভারতবর্ষেই আছে, সেখানে
লোকে বাংলা বলে, ভাবতেই অবাক লাগছে। মাঝে মাঝে কিছু পুরোনো
প্রায় ভেঙ্গে পরা কাঠের ওয়াচটাওয়ার। এগুলো ইংরেজদের বানানো, যুদ্ধের
সময়ে। তারপর একাত্তরের যুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনারা ব্যবহার করেছে, তারপরে কিছুদিন চাষিরা হাতি তাড়াতো, আর তারপর থেকে
চোর-ডাকাতের আড্ডা, বসতিও প্রায় নেই হয়ে যায়, ফলে সেই থেকে এগুলো কর্মহীন হয়ে পড়ে আছে। এসবই নীলুর কাছ থেকে জানা। লোকটা
অদ্ভভূত।
সকালেই অবশ্য আমার প্রায় প্যান্টে পটি হওয়ার দশা। রাতে দেখেছিলাম
ব্যাগটা আছে, নিশ্চিন্ত।
সকালে দাঁত মাজার ব্রাশ বের করতে গিয়ে দেখি, ব্যাগে আমার
জামাকাপড়, লেখার খাতা, বইপত্তরের বদলে
গুচ্ছের আজে বাজে জিনিস, খুলতেই পচা গন্ধ পেলাম। এসব সাথে
করেই শুয়েছিলাম ভেবেই গা’টা গুলিয়ে গেল।
যাইহোক দাঁত মেজে, হেব্লুমুখে বসে আছি, নিচের বার্থে। সকাল হতেই
মারোয়ারির মুখও চলছে। পাশে এক টেকো ভদ্রলোক, ট্রেনে যে যা
বিক্রি করতে আসছে সবার থেকে দাম-দর করে একটার পর একটা জিনিস কিনে যাচ্ছেন।
প্লাস্টিকের খেলনাই কিনলেন বোধহয় খান দশেক, শেষবার আমি অবাক
হয়ে তাকিয়েছিলাম, চোখে চোখ পড়তেই হেঁ-হেঁ করে বললেন, নাতি আছে। আর এক মুসলিম পরিবার, কোনো আত্মীয়ের
বিয়েতে চলেছে, কামড়াময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গাদা সদস্য, কিন্তু সব মাল প্রায় এনে জমা করেছে আমাদের কুপে, ফলে
ঠিকঠাক পা মেলাও যাচ্ছে না। পাশেই এক শীর্ণ সাধু সিটিয়ে বসে আছেন। সময় কাটাতে তার
সাথেই গল্প জুড়েছিলাম, কামাক্ষা যাচ্ছেন। ভাল্লাগছিল,
বাঃ হিন্দু সাধু তাও কি সাবলীল মুসলিমদের সাথে গা গা মিলিয়ে,
প্রকৃত সাধু। তা, তিনি গলা নামিয়ে বললেন,
বুঝলেন না, সবটাই পরীক্ষা, মা পরীক্ষা নিচ্ছেন, নইলে...উফফ কি বিশ্রী গন্ধ এদের
গায়ে...।
সেই থেকে একাই বসেছিলাম, একটা পত্রিকায় চোখ বোলাচ্ছি, অখাদ্য কিছু কবিতা
গিলছি, কবিদের বাপ-বাপান্ত করছি,
- বিরক্ত করছি না তো?
- আরে না না, বস...
বসুন বলতে গিয়ে কোথায় বসতে বলব বুঝে পেলাম না, ভদ্রলোক কিন্তু ঠিক বসে গেলেন আমার সামনে, কেউ বাধা দিল না। মুসলিম পরিবারের একজন তো উঠেও গেল অন্য কোনোখানে। এমনি
এর ব্যক্তিত্ব, বা শারীরিক গঠনের জন্যেও হতে পারে, গলার স্বরও মানানসই।
- কাল রাতে তো আর কথাই হল না। এখন ভাবলাম বাকি রাস্তাটা
জমিয়ে আড্ডা মারা যাবে।
- ভালোই করেছেন।
- তা আপনি একাই তো?
- হ্যাঁ,
- তাহলে আমার ওখানে চলুন, অনেক সিট ফাঁকা।
- না, মানে...
- আপনার লাগেজ?
- কেবল ওই ব্যাগটা...
- আসুন আসুন...
আমায় আর কিছু বলতে না দিয়ে সটান ব্যাগটা নিয়ে হাঁটা দিলেন, অগত্যা, আমিও পিছু নিলাম।
- বসুন, চা
খাবেন তো?
- হ্যাঁ তা...
- বাবু, দুকাপ চা।
সাইড সিট থেকে একটা মোটা গোঁফয়ালা শন্ডামার্কা লোক উঠে গেল। আমার খুব
অস্বস্তি হচ্ছে।
- একটূ জল...মানে একটা ওষুধ...
- ওই তো নিন না। কোনো
কিন্তু কিন্তু করবেন না।
আমি ওষুধটা গিলে নিলাম। ইদানীং বোধহয় একটু বেশিই খাওয়া হয়ে যাচ্ছে।
- তা বদরপুর কি লেখার কাজে?
- না আসলে ঠিক বদরপুর না, যাব নিলামবাজার।
- তাই? আরে
বাঃ, আগে বলেননি তো...ও হো, কি
কান্ড আপনাকে তো আমার পরিচয়টাই দিইনি। আমি নিলামবাজার থানার ওসি, কুমুদ কুমার দত্ত।
- ওহ, আপনি
পুলিশ।
- কি ভেবেছিলেন ডাকাত? হাঃ হাঃ হাঃ।
কিছুতেই বুঝি না, রাক্ষস, ডাকাত, দৈত্য, অসুর, পুলিশ এরা খালি খালি হাসে কেন!
বাবু চা দিয়ে গেল, সাথে শালপাতায় জড়ানো গরম গরম সিঙারা।
- তা হঠাৎ নিলামবাজার? কারোর বাড়ি?
- না আসলে যাব কাজলদিঘিতে, এক বন্ধুর বাড়ি।
- কাজলদিঘি?! কার বাড়ি বলুন তো?
- সাত্যকী রায়।
- সাত্যকী রায়?! ওনামে তো কাজলদিঘিতে...
- নৃসিংহ সিংহরায়?
- তাই বলুন, রাজবাড়ি যাবেন। উনিও তো লেখালেখি করেন।
- রাজবাড়ি?!
- হ্যাঁ, উনি তো কাজলদিঘির রাজপরিবারের ছেলে।
সাত্যকীর সাথে যে রাজপরিবারের কোনো যগাযোগ থাকতে
পারে, আমার ধারণাতেই ছিল না। এমনিতেই
এতবছর পরে হলেও ওর মুখোমুখি দাঁড়ানোটা আমার কাছে বিরাট চ্যালেঞ্জের, তার ওপর আবার এসব রাজা-গজা --- বড্ড চাপ-চাপ লাগছে।
কাজলদিহি চলে এলাম। নীলু দৌড়ে গাড়ি থেকে নেমে গেল। দেখি রাস্তার শেষে
একটা বাশ আর কাঁটা তাড়ের দরজা, ওপরের একটা বোর্ডে বড় করে লেখা কাজলদিঘি। একটা বাঁশের মাথায় একটা কম
পাওয়ারের বাল্বের আলো ঝুলছে। নীলু গেটটা খুলে দিল। গাড়িটা ঢুকে গেলে, আবার গেট লাগিয়ে দিল। বোঝা যাচ্ছে, এটা একটা
লোকবসতি। টুকরো কথাবার্তা, দৈনন্দিন কাজের আওয়াজ পাওয়া
যাচ্ছে। সামনে একটু দূরে দূরে, কিছু কিছু বাড়িতে আলোও
জ্বলছে। দেখি নীলুকে ছেড়েই গাড়িটা চলতে শুরু করল। অনেক পুরনো দিনের গাড়ি, এখনো চলছে দেখেই অবাক লাগছিল, তবে ভেতরটা বেশ
আরামপ্রদ। চালকের নাম মদন। বয়স বোধহয় গাড়িটার বয়সের কাছাকাছিই হবে।
- আরে কি হল মদনদা, নীলু যে থেকে গেল।
- চিন্তা করবেন না, সামনেই ওর বাড়ি, চলে
যাবে।
তারপর আরো কিছু অন্ধকার অন্ধকার বাড়ি ঘরের পাশ
দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ দেখি সামনে একটা প্রকান্ড দরজা। মদনদা দুবার হর্ন বাজালেন।
হর্নটা কেমন খোনামার্কা, এখন এরকম
শোনা যায় না। সারা রাস্তায় কোথাও হর্ণের দরকার পড়েনি, এই
প্রথম শুনলাম। ধাতব ঘর্ষণের
আওয়াজ করে দরজাটা হয় নিজে থেকে খুলে গেল, অথবা অন্ধকারের মধ্যে, অন্ধকার কেউ খুলে দিল,
কাউকে স্পষ্ট দেখতে পেলাম না। গাড়িটা এগোতে থাকল, দুপাশে মনে হয় বাগান, অন্ধকারে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না,
গাড়ির হেডলাইটের আলোয় যতটা গোচর হয়। গাড়িটা এগোচ্ছে যত, আমার অস্বস্তি বাড়ছে, পকেট থেকে আর একটা ট্যাবলেট
বের করে মুখে পুরলাম। অনেকদিনের চেনা লোক, অনেকদিনের অচেনা
হয়ে গেলে যা হয়। কেমন হয়? আমি এর আগে উপলব্ধি করিনি।
মিনিট পাঁচেক চলার পর, একটা বাঁক ঘুরতেই দেখতে পেলাম বাড়িটা। রাজবাড়িই বটে,
মানে প্রাসাদ আর কি। সামনে একটা গাড়ি বারান্দা। সেখানেই গাড়িটা দাঁড়ালো।
নামলাম ব্যাগ হাতে। নামতেই মদনদা, গাড়িটা নিয়ে অন্ধকারে উধাও
হয়ে গেলেন। ভেতরে কিছু আলো জ্বলছে। ভেতরে যাব? নাকি এখানেই
দাঁড়াবো --- বুঝে না পেয়ে বেকুবের মতো দাঁড়িয়েই রইলাম।
- ব্যাগটা দিন, বাবু।
অন্ধকারে প্রায় মিশেই দাঁড়িয়ে ছিল লোকটা। রোগাটে
গড়ন, মাঝারি উচ্চতার।
- না, না,
একটাই তো ব্যাগ।
- তা বললে হয়, আপনি অতিথি।
ব্যাগটা ওর হাতে ধরিয়ে পেছন পেছন চললাম। দরজা পেরিয়ে কয়েকটা ছোটো
ছোটো অন্ধকার ঘর, সেগুলো
পেরোতেই এসে পড়লাম একটা প্রকান্ড ঘরে। এটাই কি রাজদরবার?
রাজবাড়ির ঝাড়লন্ঠনটা ঝুলছে, কিন্তু ওটা জ্বলছে না, বরং তার থেকে ঝুলছে একটা তার,
তারের মাথার হলদে ইলেকট্রিক বাল্ব। তারই নিচে একটা তাকিয়া সম্বৃদ্ধ
তক্তপোষে একটা লোক বসে, পাশে একটা গড়্গড়া, তার নলে মাঝে মাঝে টান পড়ছে। আমরা ঢুকতেই লোকটা উঠে দাঁড়াল।
- এস এস...
এই তবে আমাদের স্যাটা? বুঝতে পারছি গা শিড়শিড়ে ভাবটা ফিরে আসছে।
- কি রাজাবাবু চেনা
যাচ্ছে?
এই বোকা বোকা কথাটা ছাড়া, কথা শুরুর জন্য আর কিছু এল না মাথায়। জবাবে সে কেবল মৃদু হাসল।
- অনেক পথ পেরিয়ে এলে, খিদে পেয়ে গেছে নিশ্চই, ওর নাম পল্টন। ওর সাথে
যাও, ও তোমায় ঘর দেখিয়ে দেবে, হাত
মুখ ধুয়ে খেয়ে নাও।
- তুমিও খাবে তো?
- মার্জনা কোরো, আমার রাতের খাওয়া হয়ে গেছে। আসলে আমাদের
এখানে অনেক তাড়াতাড়ি রাত হয়। শহরের মতো না। তুমি খেয়ে, শুয়ে
পড়। কাল কথা হবে।
৫
- আচ্ছা এই যে নীলু, মানে কালকের ঐ কফিয়ালা, মনে হল আপনার পরিচিত...
- পরিচিত মানে, ও আমার সবচে’ কাছের বন্ধু ছিল, নীলকান্ত।
- ও?!
- যে কাজলদিঘি যাচ্ছেন, ওখানেই বাড়ি। আমাদের স্কুলে পড়তো, দারুন
অ্যাথলিট ছিল। আর তাতেই একবার ধরা পড়ে যায় যে, ও ভারতের
নয়, ছিট্মহলের। তাও আমাদের হেডস্যার ওকে অ্যালাও
করেছিলেন। কিন্তু এদের যা হয়, এখন নেশা-ভাং করে পড়ে
থাকে।
- কাল দেখলাম ও প্ল্যাটফর্ম ঝাড়্ দিচ্ছিল...!
- হ্যাঁ ঐ আরেক পাগলামি, ওরা আসলে বৌদ্ধ বুঝলেন তো, তা কখনো কোথাও নোংরা দেখলে গিয়ে ঝাঁড়্ দিচ্ছে, যেতে যেতে দেখলো কারোর জলের পাইপ ফেটে গেছে, সব
ফেলে লেগে গেল সারাতে। অদ্ভূত লোক।
খেয়ে ঘরে এসেই নিম্নচাপ অনুভব করেছিলাম। ঘরটা বেশ বড়, কিন্তু সবচে’ আকর্ষনীয় খাটটা,
এগুলোকে পালঙ্ক বলে, এই প্রথম পালঙ্কে শোব,
ভেবেই উত্তেজিত হয়ে গেছিলাম।
- পল্টন, বাথরুমে কমোড আছে?
- বাবু কমোড কি?
সেরেছে! শেষে বসার মুদ্রা করে বোঝানোর চেষ্টা
করলাম। কাজ হল।
- না বাবু, সে তো
নেই, তবে রাজাবাবুর বাপের যখন অসুখ করেছিল, তখন ডাক্তার একটা চেয়ারের মতো দিয়েছিল, মাঝে
ফুটো করা। কাল সেটাই লাগিয়ে দেব।
- আচ্ছা, বেশ।
তারপর যে বাথরুম দেখালো, আমার তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া। শোয়ার ঘর থেকে কিছু না
হলেও একশ’ মিটার দূরে! যাওয়ার রাস্তাটা ঘুটঘুটে অন্ধকার।
খেয়ে এসে আর সামলানো গেল না, আসলে ট্রেনে আমি যেতে পারি না।
তো কি আর করা, বসতে যাব, দেখি ঠিক পেছনের দেওয়ালে একটা কালো,
রোমশ, হাতের তালুর সাইজের মাকড়শা। বাস রে!
হাগা মাথায় উঠল, একবার ভাবলাম রাতটা চেপে কাটিয়ে দিই,
কিন্তু বেরিয়ে আসতে গিয়ে বুঝলাম তা সম্ভব না। তাই নীলকান্তর
কথা-এটা-সেটা ভেবে মনকে বিক্ষিপ্ত করতে চাইছি।
- আচ্ছা নীলকান্ত, দত্তসাহেব বলছিলেন তুমি নাকি রাস্তায়ঘাটে লোকের জলের পাইপ টাইপ ফেটে
গেছে দেখলে সারাতে চলে যাও,
- যাই তো। জলের সময়, জোঁক আসে, সাপ আসে। তাও যাই।
- জোঁক ধরে না?
- ধরে না আবার! এখানে ওখানে কামড়ে ধরে আছে, ও আমি পাত্তা দিই না। কি করবে?খুন চুষবে? চোষ ব্যাটা, কত
চুষবি। পেট মোটা হয়ে গেল তো নিজেই পড়ে যাবে না?
- আর সাপ?
- সাপে ভয় নেই। নাঃ, ওসব আমাদের দোস্ত। ভগবান কি বলে? কর্ম কর। তো
আমি কর্ম করে যাই, যতটুকু হয়।
- তুমি তো খুব ভালো লোক দেখছি, আচ্ছা রাজাবাবু কেমন লোক?
- উনি তো দেব্তা। উনিই তো কাজলদিঘির চোর-ডাকাতদের তাড়ালেন।
- আচ্ছা?
৬
সবুজে সবুজ জায়গাটা, আমি অনেক সবুজ দেখেছি, কিন্তু এত সপ্রাণ বোধহয় কখনো দেখিনি। কত কত পাখি ডাকছে, কিছু আছে যাদের গলা চিনি, কিন্তু দেখিনি কখনো, চিনি না নামে, চেহারায়, আর কিছু চেনা। কাক-শালিখ-চড়াই তো মনে হয় সব জায়গায় আছে। সবুজ ঘেরার মাঝে একটা ছোট্ট পুকুর, চারপাশের সবুজের ছায়ায় তার টলটলে জলটাও মনে হচ্ছে সবুজ রঙের। ডালপালার ফাঁক দিয়ে ফাঁক দিয়ে সকালের রোদ এসে পড়েছে পুকুরের মাঝে মাঝে। জানলা দিয়ে এতটাই দেখা যাচ্ছে। ওরা বলল, নিচে যাও, ধরে দেখ, নেড়ে দেখ।
নেমে এলাম, ভোরের কুয়াশা কেটে গেলেও শীতভাবটা কাটেনি। তাও পুকুড়ের জলটায় মনে হল খুব নরম একটা উষ্ণতা আছে, মেয়েদের কোলে মাথা রাখলে যেরকম স্বাভাবিক ওম পাওয়া যায়। ওরা আমায় বলল, উদবেগ রোধক বড়িগুলো ফেলে দিতে পারো। খুব চান করতে ইচ্ছে হল। তেল গামছা চিরুনি কিছুই তো আনিনি। আরে এরকমি একটা পুকুর চরকাকাটা বুড়ির গল্পে ছিল না?
আমায় দেখেনি, দেখতে চায়নি তাই। কেবল ডানপায়ের আঙ্গুলের ডগা দিয়ে পুকুড়ের জলটা নেড়েচেড়ে দেখল। যথেষ্ট সময় নিজেকে আড়াল করার জন্য, আর এখানে এত ঝোপঝাড়। আমি লুকোতেই ও ঠিক আমি যেখানে ছিলাম সেদিকেই তাকালো। কিছু টের পেয়েছে বোধহয়, অনেকের ষষ্ঠেন্দ্রীয় সাধারণের থেকে বেশি সক্রিয় হয়। মেয়েদের বোধহয় ছেলেদের থেকে বেশিই হয়, মেয়েরা ছেলেদের বলে না, জানতে দেয় না, অনেক কিছু টের পেয়ে যায়। আমি লুকোলাম কেন? ছবিটা নষ্ট করতে চাইনি বলে।
এই বয়সে মেয়ে দেখছি। মেয়েটি কচি, ডাঁশা --- যেরকম কবিতায় বলে থাকি, নইলে কবিত্ব থাকে না। আমি জানি মেয়েটা চান করতে এসেছে, আমি ওর চান করা দেখবো বলে ঘাপটি মেরে আছি, যেটা দেখার কতটা খোলে, কিভাবে খোলে, আর কতটা কবিতার মতো হয়। খুলল, সব খুলল, সব বলতে একটাই তো কাপড়। কিন্তু তারপর? জলে নামার আগেই বাতকর্ম! আমার সব ইন্দ্রীয় তখন সজাগ, স্পষ্ট শুনলাম। প্রস্তুত ছিলাম না, মনে হলো ট্রেনের সেই মারোয়ারিটার গন্ধ পাচ্ছি।
যাকগে এই অংশটা বাদ, জলে নেমেছে, ডুব-স্নান করছে --- আমার সব কবিতা গুলিয়ে গেল।
- পার্থ, পার্থ, ওখানে কি
করছো?
চমকে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াতে গিয়ে ওপরের একটা ডালে দড়াম করে গুঁতো লেগে, ডিগবাজির মতো হল, আর ঢালে তাল
রাখতে না পেয়ে স্যাড়াত করে সোজা জলে।
পেছনে মেয়েটা হাসছে, আমি দুর্যোধন হয়ে যেতে চাইলাম, কিন্তু উঠে আসতেই হল
- আসলে...
অনাবশ্যক গলা ঝাড়লাম
- মানে অনেকদিন পর পুকুড়
দেখে মনে হচ্ছিল চান করি...
সাত্যকী অত্যন্ত শান্ত, আমার মনে হল মাত্রাতিরিক্ত। মুখে মৃদু হাসি।
- তোমার তো আজকের চান হয়েই গেল দেখছি। আমি বলতে এসেছিলাম
জলখাবার তৈরী, তুমি জামাকাপড়
বদলে এস।
- হ্যাঁ...
৭
- আপনি আমায় আগে বলেননি তো, ট্রেনে বললে হয়তো আমি চোর কে ধরেও ফেলতে পারতাম,
- আরে ছাড়ুন তো, গেছে তো ভারী কয়েকটা পুরোনো জামা আর কিছু বই খাতা।
- দাঁড়ান আগে দেখি বদলে কি ভরেছে,
- আরে না না, খুব নোংরা কিসব আছে, পচা গন্ধ, আপনার ঘরটা নোংরা হয়ে যাবে।
- কি ভেবেছেন, ওর মাথায় একবার ঢুকেছে যখন এত সহজে বার করতে পারবেন?
- কি মুশকিল বলুন তো, আমি তো দত্তসাহেবকে কেবল বলছিলাম,
কয়েক সেট জামা প্যান্ট কিনব, তাই এখানের
কোনো দোকানের সন্ধান দিতে...এহহ্, ওহ মাই গড! এগুলো কি?
আমার ব্যাগ থেকে দত্তবাবু যেগুলো বের করলেন সেগুলো আমার নাগালের অনেক
বাইরের --- হাড়গোড়, পচা গলা
পশু-পাখির দেহাংশ, পোড়া মাটির কিছু পুতুল এরকম।
- শকুনের ঠ্যাং, বেড়ালের করোটি, সম্ভবত
কালো বেড়ালের, এগুলো হল অভিশপ্ত পুতুল, আর এই খয়েরি খয়েরি কাপড়গুলো সম্ভবত কোনো ভার্জিন মেয়ের...
কথাটা আর শেষ করলেন না।
- এতসব জানলেন কিকরে? কিহয় এসব দিয়ে?
- প্রজাপতিবাবু, এসব তান্ত্রিকদের নানা রিচুয়ালের
ব্যাপার-স্যাপার, কামাক্ষার ওপর দিয়েই তো এলাম, কামাক্ষা হচ্ছে তান্ত্রিকদের সবছে বড় তীর্থ। এ-অঞ্চলেও
অনেকেই তন্ত্র মন্ত্র প্র্যাকটিস করে। হামেশাই আমাদের হাতে আসে...।
সাত্যকীকে বলেছিলাম, তাড়াতাড়ি চান করে আসছি। কিন্তু অনেক্ষণ হয়ে গেল, আসলে
খুব লজ্জা করছে। রাতে ভালো করে দেখতে পাইনি, বাথ্রুমের ঘরটা
বিশাল, লাগোয়া একটা ছোটো জামা-কাপড় ছাড়ার ঘর। বিশাল ঘরটার
একপাশে একটা পরিষ্কার চৌবাচ্চা, আর একপাশে একটা পেতলের
বাথটাব, সাথে একটা পেতলের জলের কল। কল খুলতেই মিস্টি,
মৃদু গরম জল পড়ল, ব্যাস সেই থেকে বাথটাবে শরীর
ডুবিয়ে বসে বসে, গতকালের কথা ভাবছি। হঠাৎ কোনো তান্ত্রিক
আমার পেছনে কেন পড়বে কে জানে! বদরপুর থেকে আমি আর নীলকান্ত দত্তসাহেবের গাড়িতেই
এসেছিলাম নিলামবাজারে। দত্তসাহেব নিয়ে গেলেন তার বাড়িতে, অতঃপর
তাঁর স্ত্রী, বেশ সুন্দরী, আমার কবিতার
ভক্ত। তিনি না খাইয়ে ছাড়বেন না। দেখলাম নীলকান্তর সঙ্গেও তাঁর খুব ভাব। নীলুদা
নীলুদা করে ডাকেন। রান্নাটাও বেশ করেন। তারপর দু-তিনটে নৌকো পালটে বেশ কিছু খাড়ি
টাড়ি পেরিয়ে অবশেষে একটা গঞ্জ মত এলাকায় পোঁছলাম, কি যেন নাম
বলেছিল নীলু...। যাকগে সেখান থেকে আবার একঘন্টা মত গেলে একটা পাকা রাস্তা পড়ে,
সেখানেই দেখা হয়েছিল মদনদার সাথে।
হঠাৎ কিছু একটা আওয়াজ পেয়ে চিন্তার জাল কাটিয়ে তাকিয়ে দেখি ঘুলঘুলিতে
একজোড়া চোখ, আমি
তাকাতেই পরিচিত খিলখিল মেয়েলি হাসি, সাথে চোখদুটো সরে গেল।
নাঃ এবার যাওয়া দরকার।
৮
- কেমন লাগছে বল?
- একটা কথা বলবো...
- বল,
- মানে, আগে
তো আমরা তুই তুই করে বলতাম,
- ও, তাই না? দুঃখিত, ভুলে গেছিলাম, আসলে
বয়সটাও অনেকটা বেড়ে গেছে, অনেকদিন যোগাযোগও ছিল না,
হঠাৎ করে তুই বলাটা...আছো তো ক’দিন,
এর মধ্যে নিশ্চই...তুমি কিন্তু আমায় স্বচ্ছন্দে তুই বলতে পারো।
- বাঁচালি। আমার তো আগে ধারণাই ছিল না তুই কোনো রাজবংশের
ছেলে। এই গোটা ঘেরা জায়গাটা তোদের?
- হুমম্। সব মিলিয়ে প্রায় আঠারো বিঘা জায়গা, দেখাশোনা করা কঠিন।
- আঠারো বিঘা?
- হুমম্, আম,
কাঁঠাল, আরো নানা ফল-ফুলের গাছ, আর মহল্গুলোও এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে,
- আমি তো একা বেরোলে হারিয়েই যাব রে...
- একা না বেরোনোই ভালো, শীতে সাপ বেরোয় না খুব একটা, তবে শেয়াল টেয়াল
আছে, একা পেয়ে কামড় টামড় দিলে মুশকিল।
- বাবা রে! হসপিটাল তো বোধহয় সেই নিলামবাজারে?
- হুম, তবে আমাদের নিজেদের চিকিৎসার ব্যবস্থা
আছে, আয়ুর্বেদিক, চিন্তা নেই।
সাত্যকী খুব গর্বিত মুখে আমাকে নানা গাছ, পাখি দেখাতে দেখাতে চলল। আমার সেদিকে খুব একটা ধ্যান
থাকছে না। একসময় আমরা খুব কাছের বন্ধু ছিলাম, কিন্তু আজকে
যার সাথে হাঁটছি, সেও একই লোক --- ভাবতেই পারছি না। আগে খুব
নাটুকে লেগেছিল, কিন্তু এই মুহুর্তে মনে হল এই লোকটার জন্য
নৃসিংহ সিংহ-রায় মার্কা নামই মানানসই।
- তুই হঠাৎ নৃসিংহ সিংহ-রায় হলি কবে থেকে?
- হাঃ হাঃ, এটা আমার ফ্যামিলি ট্র্যাডিশন। জন্মের পর
এরকম একটা সিংহ মার্কা নাম দেওয়া হয়। স্কুলে ভর্তির সময় বাবা পাল্টে দিয়েছিল।
কোলকাতা ছেড়ে এখানে এসে ভিড়লাম যখন, ভাবলাম নামটাও
এখানকার অনুযায়ী হোক। আর আগের নামটা তো পচেও গেছিল, এত
দুর্গন্ধ...
এই প্রসঙ্গটার ভয়ই পাচ্ছিলাম। বলতে বলতে দেখি ওর মুখ কুঁচকে গেছে, খুব ঘৃণা জড়ানো, চোখের কোলটা
টলটল করছে। ওকে এখন বলব? নাঃ আমি তৈরী নই। আমার মাথাটা কেমন
ঘুরে মতো গেল।
- কি হল তোমার?
- না, একটু
খাওয়ার জল, মানে একটা ওষুধ খেতে হবে...
- চল মন্দিরের ওদিকে যাই, ওখানে জলের কল আছে।
- অনেকটা দূরে?
- নাঃ, ওই তো
চূড়োটা দেখা যাচ্ছে। এই মন্দিরটার বয়সও হাজার বছরের বেশি।
- বলিস কি? তদের
ফ্যামিলি এখানকার ক’বংশের রাজা? এটা
কাদের ছিট্ ছিল? কোচ রাজাদের?
- মোটেই না। আমাদের
স্বাধীন রাজ্য, মোগল, কোচ, ব্রিটিশ--- কাউকে ঢুকতে দিইনি।
সাত্যকীকে হঠাৎ খুব হিংস্র দেখাচ্ছে।
- কিন্তু এখন তো ইন্ডিয়ারই...
- সে তো কাগজ কলমে অনেকেরই ছিল, কত হাতবদল। কি বল তো, এই জায়গাটা এতটাই দুর্গম, কেউ খুব একটা ঘাঁটায়
না, মাথাই ঘামায় না। প্রথমে এসে দেখি চোর ডাকাতদের
রাজত্ব। রাজপরিবারের তো একটা দায়িত্ব আছে না? দিয়েছি
সবকটাকে ভাগিয়ে।
- হ্যাঁ, কাল
নীলু বলছিল।
- ও, নীলকান্তর সাথে আলাপ হয়েছে? বড় ভালো লোক।
মন্দির এসে গেছিল। সামনের হাফ-দরজাটা বন্ধ, কেবল ওপরের দিকের ফাঁকা অংশটায় পর্দাটা দেওয়া ---
সেটা একটু সরে আছে। সেখান দিয়ে ভেতরে তাকালাম, কেবল একটা
প্রদীপ জ্বলছে। আল-আঁধারিতে চোখ খাপ খেয়ে গেলে বিগ্রহে চোখ পড়ল।
- শব্দ কোরো না, দেবী এখন নিদ্রায়।
সাত্যকী কানের কাছে ফিসফিস্ না করলেও আমার মুখ থেকে শব্দ বেরত না।
এত ভয়ঙ্কর বিগ্রহ আমি আগে দেখিনি, কালিই মনে হল, কারণ রঙটা কালো। বিরাট বিরাট চোখের
মণিজোড়া লাল, দাঁত কিড়মিড়িয়ে আছে, মুখ
দিয়ে রক্ত ঝড়ছে। একহাতে খাঁড়া, আরেক হাতে নরমুন্ড। তার নগ্ন
শরীরে পেঁচিয়ে রয়েছে দুটি সাপ --- যাদের মুখ পুরুষ মানুষের মতো। তারা দেবীর
স্তন-পান করছে, কিন্তু তাদের মুখ থেকেও রক্তই গড়াচ্ছে। আমার
খুব অস্বস্তি হল। ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে।
- ওষুধ খাবে তো, এই যে জল।
আবার ও আমায় বাঁচালো, আমি বিগ্রহের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ওষুধ খাওয়ায় মন দিলাম, ও বলে চলল।
- দেবী রুদ্রচন্ডি, আমাদের কূলদেবী।
- খুবই ভয়ঙ্কর রূপ!
- তা বটে।
মৃদু হাসল।
- এ অঞ্চলের কত অদ্ভূত সব লোকায়ত বিশ্বাস, দেবদেবী, লোককথা।
জানলে অবাক হয়ে যাবে। চল তোমায় আর একটা অদ্ভূত জায়গা দেখাই, তবে তোমায় কথা দিতে হবে, যেখানে যাচ্ছি,
সেখানে কখনোও একা একা যাওয়ার চেষ্টা করবে না।
- সেরকম কৌতূহলের জায়গা হলে...
- না, আমি
সিরিয়াস, এটা ইয়ার্কির বিষয় নয়।
- আচ্ছা চল,
- আগে কথা দাও।
- ওকে, কথা
দিলাম। হবে?
- শহুরে বিশ্বাসে উড়িয়ে
দিও না, প্লিস্।
দুজনে বাগানের মধ্যে দিয়ে এগতে যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি একটা নোংরা চাদর গায়ে, নোংরা,টাকমাথা একটা লোক, কাচের
গুলির মতো দুটো চোখ, কোটরে ঢোকা, একদৃষ্টে
আমার দিকে তাকিয়ে।
- কি ব্যাপার নেড়ু?
তারপর আমায় দেখিয়ে বলল,
- বন্ধু, আমার বন্ধু।
এবার নেড়ু হাসল, শিশুর মতো। মুখে একটাও দাঁত নেই।
- আম খাবে?
- এই শীতকালে আম?
- এই গাছটায় হয়।
পাশের একটা গাছে দেখি সত্যি আম পেকে আছে।
নেড়ু আমটা পেয়ে একগাল হাসল, তারপর আমার দিকে এগিয়ে এল। বেশ অস্বস্তিজনক কাছে, মুখে
আনন্দের ভাবটা আছে এটাই ভরসার। হঠাৎ খপ করে আমার জামার কলারটা চেপে ধরল, আতংকে আমার গলা কেঁপে গেল,
- সাত্যকী...
- গল্প থাকে সবার কাছে, বন্ধু, তোমার গল্প
বল।
নেড়ু হাসছেই, সাত্যকী
ওর হাতদুটো ছাড়িয়ে নিল।
- আমি বলব গল্প,এখন না, পরে। কেমন?
এখন আমি আর বন্ধু একটু ঘুরতে বেরিয়েছি...
নেড়ু “গল্প
থাকে সবার কাছে” বলে চিৎকার করতে করতে ছুটে চলে গেল। আমি
তখনও হাফাচ্ছি।
- তুমি ঠিক আছো তো?
- এরকম পাণ্ডববর্জিত জায়গায় এসব পাগল ছাগলের মধ্যে পড়ে
থাকতে ভাল্লাগে?
- কেন ভালো লাগবে না? দারুন লাগে। বললে না, পাণ্ডববর্জিত? ঠিক তাই। এখানে পান্ডবরা আসতে
পারেনি, দুর্গম জায়গা, এখানে লড়াই
করে বাঁচতে হয়। বাইরের কেউ ঘাঁটাতে পারেনি বলেই এখানকার মানুষজন প্রকৃতি সবই
শুদ্ধ। কাদের পাগল-ছাগল বলছ? তোমাদের মতো এদের ভনিতা
কোনো নেই, ন্যাকামি নেই...বুঝলে? হাজার
হাজার বছরের পুরনো গল্প আছে। কাজলদিঘিতে একশ বছরের বেশি বয়সের মানুষ আছেন
নয়জন। তাদের একজন পশুপাখিদের সাথে কথা বলতে পারে...জানো সেসব? না জেনেই তুমি বলে যাচ্ছ?
সাত্যকী হঠাৎ এতটা খেপে যাবে আমি বুঝতেই পারিনি। এসব পাগল-ছাগলের
সাথে থেকে থেকে মাথাটাই গেছে বোধহয়, আর কালিদা ভাবছে একে দিয়ে লেখাবে। যদিও বেমানান পড়ে আমি চমকে গেছি।
- না মানে আমি তো সেরকমভাবে বলিনি।
- দুঃখিত, আসলে
আমি এই জায়গাটা নিয়ে খুব আবেগপ্রবণ। কিছু মনে কোরো না।
- বুঝতে পারছি, আমারও ওভাবে বলাটা ঠিক হয়নি, আচ্ছা, তুমি লেখাটা লিখছ তো?
- হাঃ হাঃ, লেখার কথাটা মাথা থেকে যায়ই না, না? পাবে পাবে যাওয়ার আগে ঠিক পেয়ে যাবে। এখন
সামনে দেখ তো।
সামনে তাকিয়ে বিস্ময়ে আমার মুখ দিয়ে আর কথা বেরোল না।
৯
গত কয়েকদিনের মধ্যে আজ আমি অনেকদিন পর নিশ্চিন্তে ঘুমাব। অবশেষে
ওগরাতে পেরেছি দলাটা। রাতের রাজকীয় ভোজে বসেই ঠিক করেছিলাম, যা হওয়ার হবে, আজ বলতেই হবে।
- তোকে একটা কথা অনেকদিন আগে থেকে বলব বলে ঠিক করে
রেখেছিলাম আগে তো সূযোগ হয়নি।
- কিকথা?
- আয়াম সরি। তোর যখন দরকার ছিল, আমি পাশে থাকতে পারিনি। আমার থাকা উচিৎ
ছিল। আসলে আমিও তখন কেরিয়ারের শুরুতে...না কোনো অজুহাত দেওয়া চলে না।
- আরে, ও
কিছু না। আমি বুঝেছিলাম। কিছু মনে রাখিনি, বিশ্বাস কর।
আসলে এখানে আমার এত দায়িত্ব,
- আমি বলে হাল্কা হলাম, তুই তো মোবাইল, ফেসবুক, টুইটার,
কিছুই করিস না। তোকে খুঁজে পেতে যা ঝক্কি গেছে...
- আমার ওসব ভালো লাগে না। এই বেশ আছি বাদাবনের শেয়াল রাজা।
- কিন্তু তোর উপন্যাসটা নিয়ে কিন্তু ফেসবুক টেসবুকে দারুন
হইচই।'
- হ্যা, অম্বিকাবাবু
বলছিলেন।
- অম্বিকা?
- আমার এখানেই থাকেন। কিসব গাছগাছড়া নিয়ে গবেষণা করছেন।
কাজলদিঘিতে তো অনেক ভেষজ গুনের গাছ আছে। আমিও বলে দিয়েছি, শর্ত একটাই বাইরে পালানো চলবে না। তা উনি
এখানে ভালোই আছেন। আমাদের ওষুধপত্রও উনিই করে দেন। শিলিগুড়ি গেছিলেন কাজে। এই
একটু আগে এলেন। এই পল্টন অম্বিকাবাবুর হয়নি?
- উনি তো বললেন এক্ষুনি আসছেন।
- কই, সাহিত্যিক মহাশয় কই?
যার প্রবেশ ঘটল তার জন্য আমি তৈরী ছিলাম না। সেই ট্রেনের সাধুবাবা।
- আপনি? আপনি
সাধু নন?!
- হাঃ হাঃ হাঃ, সে কি সাহিত্যিক মশাই, সাধু হলে গবেষক হওয়া যায়
না? গবেষণাও তো সাধনা...
- ও আপনাদের আলাপ হয়েছে?
- হ্যাঁ এক ট্রেনেই এসেছি আলিপুরদুয়ার থেকে, উনি কামাক্ষাপুরীতে নেমেছিলেন।
- মা’কে দর্শন করে এলাম।
আমার ধারণা একটা ছিল, ব্যাগে ওইসব শকুনের ঠ্যাং ইত্যাদি এই সাধুটাই রেখেছে, রাতের খাওয়ার টেবিল থেকে ঘরে ফিরে শুয়ে শুয়ে ভাবতে গিয়ে সেটাই বদ্ধমূল হল।
সাত্যকীর কথাবার্তা মোটেই স্বাভাবিক লাগছে না। নিশ্চই এই সাধুবাবার কিছু মতলব আছে,
কিছু একতা চক্রান্ত করছে, এখানকার রাজাকে বশ
করে। আর তন্ত্র মন্ত্র করে আমার আসাটা আটকাতে চেয়েছিল, কারণ
আমি ধরে ফেলব।
যাক, বুঝে যখন
ফেলেছি, তখন আর চিন্তা নেই। এইসব ঘটনা, সাথে রাজ-আতিথ্যের খাদ্য আয়োজন, কত রকমের যে মাছ
খচ্ছি, যাইহোক সব মিলিয়ে মনে বেশ ফুরফুরে ভাব এসেছিল।
বেমানান শেষটুকু বাকি, একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে
আরামকেদারায় কম্বল টেনে, আয়েশ করে বসে সেটাই পড়তে বসলাম। কখন
যে হাতে পত্রিকাটা নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছি, টের পাইনি। হঠাৎ
ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। কোথায় আছি বুঝতে একটু সময় লাগলো, আরামকেদারাতেই
বসে আছি, ল্যাম্পটাও জলছে। নাঃ, এবার
পালঙ্কে যাই। সবে বইটা টেবিলে রেখে চটি গলিয়ে ঊঠে দাঁড়িয়েছি, মনে হল রাজবাড়ির বিশাল বাগানের ভেতর যেন কোনো বাচ্চা কাঁদছে। জানলার পাশে
এলাম। অনেকটা দূরে বাগানের ভেতর কেউ মশালের মতো কিছু জ্বেলে ঘোরাঘুরি করছে,
একটা কাঁপা-কাঁপা আলো দেখা যাচ্ছে।
রাতের ওষুধ খাওয়া হয়নি। খেয়ে শুয়ে পড়লাম। কি দেখতে কি দেখেছি। সঙ্গে
সঙ্গে মনে হল কেউ একটা ঘরের ঠিক সামনে দিয়ে দৌড়ে গেল।
- কে?
কোনো সাড়া নেই। কিছুতেই উঠব না। চেনা নেই, জানা নেই। আমি বুঝে গেছি এখানে কিছু একটা গন্ডগোল
আছে, সবার মধ্যেই কেমন লুকনোর ভাব, কিন্তু
রাতে কিছু করা যাবে না। সকালের আগে আমায় কিছুতেই ফাঁদে ফেলা যাবে না। আমি চোখ বুজে
শুয়ে রইলাম। আবার মনে হল যেন কেউ এগিয়ে আসছে, একটা ঘুঙুরের
শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
- কে?
জানতাম সাড়া পাব না। এবার মনে হল, কেউ যেন আমার মুখের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে, চেপে বসেছে
শরীরের ওপর। আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চোখ বুজে মরার মতো পড়ে থাকার প্ল্যানটা
আর কার্যকরি মনে হচ্ছে না। চোখ খুলতেই দেখি একটা মুখ। আতঙ্কে চেচিয়ে উঠলাম। আর সেই
মেয়েটা খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে আমার বুকের ওপর থেকে নেমে দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
তবে রে, আমার সাথে ছেনালী, আজ রাতেই
মজা দেখাব।
কম্বল সরিয়ে শালটা জড়িয়ে বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে। আমার ঘর থেকে বেরলেই
সিঁড়ি অব্ধি লম্বা একটা করিডোর, একটা মাত্র টিমটিমে হলদেটে বাল্ব জ্বলছে। করিডোরের একেবারে শেষ প্রান্তে
মেয়েটা দাঁড়িয়ে। করিডোরের দেওয়ালে একটা বড় কাঁচ বাধানো ছবিতে আমার ছায়া পড়েছে,
একঝলক চোখ পড়ল। নিজেকে নিজেরই হিংস্র পশু বলে মনে হল। চুল
উস্কোখুস্কো, গায়ের শালটা একপাশে ঝুলে পড়েছে, গোটা গা দিয়ে যেন আগুন ছুটছে। মেয়েটাকে আমার দমন করতে ইচ্ছে করছে, পিষে ফেলতে ইচ্ছে করছে। মেয়েটা আমায় দেখে ফিক করে হেসে আঁচলটা ফেলে দিল।
আলো-আঁধারীতে ওর শরীরের বাঁক-খাঁজগুলো আর রহস্যময় লাগছে, কালো
চামড়ায় হলদেটে আলোটা পিছলে পিছলে যাচ্ছে। বাঘের মতো কামড়ে খাবলা মাংস তুলে নিতে
ইচ্ছে হচ্ছে ওর বুক থেকে। আমার গলা থেকে একটা কুৎসিত ঘড়ঘড়ে আওয়াজ তৈরী হচ্ছে,
বাঘের মতোই এক’পা পিছিয়ে মুহুর্তে ধেয়ে গেলাম
ওর দিকে, মেয়েটাও চকিতে পালালো সিঁড়ি দিয়ে নিচে। আমিও নেমে
এলাম।
আজ পূর্ণিমা নয়, তাও জোৎস্না আছে, চাঁদের নরম আলোয় আবার দেখতে পেলাম
ওকে। দুস্টু হাসি মেখে বসে আছে, একটা নিচু আমগাছের ডালে। আমি
এগোতেই, নেমে আবার ছুট লাগালো। আবার বাগানের কোথাও বাচ্চাটা
কেঁদে উঠল। এবার মনে হল মেয়েটাও কাঁদছে। আওয়াজটার উদ্দেশ্যে এগিয়ে দেখি বাগানের এক
জায়গায় মেয়েটা বসে, কোলে একটা বাচ্চা। বাচ্চাটা মুখ গুজে
দিয়েছে মেয়েটার স্তনে। দুধ খাওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু দুধ
নেই। খিদেয় কাঁদছে। মেয়েটাও বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। অন্য
সময় হলে হয়তো অন্যরকম হত, কিন্তু এখন এসব বাচ্চা-ফাচ্চা আমার
ভাল্লাগছে না। ঐ মেয়েটাকে আমার চাই।
আমি দৌড় শুরু করতেই কান্না-টান্না থামিয়ে খিলখিলিয়ে হাসি আর আবার
বাগানের কোথাও একটা লুকিয়ে পড়ল, এদিক ওদিক থেকে হাসির আওয়াজ আসছে আর আমি ছুটে যাচ্ছি সেদিকে। ঠিক যেন
বাঘ-হরিণে লুকোচুরি চলছে। দৌড়তে দৌড়তে হঠাৎ মনে হল এ নিশ্চই ঐ তান্ত্রিক সাধুটার
কাজ, কোনো মায়া। এই ফাঁদে পা দেওয়ার মানেই হয় না। সবে ফিরব
ভাবছি,দেখি জ্ঞানমন্দিরের সামনে এসে পড়েছি। দুপুরের থেকেও
বেশি রহস্যময় লাগছে।
দুপুরে সাত্যকী যখন এর সামনে এনে দাঁড় করিয়েছিল, খানিক্ষণ সত্যিই আমার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ হয়নি। একটা
বিশাল উঁচু স্থাপত্য, নিচের দিকটা সরু, ওপরের দিকটা ফানেলের মতো চওড়া হয়ে উঠে গেছে। তার চারপাশ দিয়ে পাকানো সিঁড়ি,
কোনো রেলিং নেই।
- এটা কী রে?
- কোনো ধারণা নেই। হাজার হাজার বছর ধরে এখানে এভাবেই রয়েছে।
একটুও পুরনো হয়নি। এখানকার লোক বলে জ্ঞানমন্দির।
- জ্ঞানমন্দির? ইন্টারেস্টিং, দেখে তো মনে হচ্ছে মানমন্দির। কি
আছে এর মধ্যে?
- কেউ জানে না।
- সে কী? কেউ
চেষ্টা করেনি ওপরে ওঠার? ভেতরে ঢোকার?
- অনেকেই, তবে
সবাই মারা গেছে। কেউ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে, কেউ বা সাপের কামড় খেয়েছে, কেউ উঠতে গিয়ে
অসুস্থ হয়ে নেমে এসেছে, ডাক্তার ধরতে পারেনি সে রোগ,
ক্রমে মৃত্যু --- এরকম অনেকগল্প আমি শুনেছি। তবে সবাই বিদেশি।
এখানকার কেউ না, এখানকার লোক বহু বছর ধরে এর কথা জানে,
কেউ ধারে-কাছে আসে না।
- নিশ্চয় গুপ্তধন আছে।
- থাকতে পারে, বিদেশী মদের পিপেও থাকতে পারে, আবার দেখলে হয়তো
নরকঙ্কাল পড়ে আছে।
- একবার স্যাটেলাইট ইমেজে ওপরটা দেখলে কিছুটা বোঝা যাবে।
- ওপরে কিছু নেই, পুরোটা সিল করা।
- কিকরে জানলি?
- আমি উঠেছি।
- সেকি তবে যে বললি...
- একটা কিংবদন্তির মতো আছে, একমাত্র আমাদের বংশের লোকজনই এর ওপরে যেতে পারে, তবে তাকেও নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। তুমি নিশ্চই বিশ্বাস করবে না,
কিন্তু আমি যখন উঠছিলাম, তখন প্রথমে বেশ
কিছু সাপ তেড়ে এসেছিল। তারপর আমার সামনে এসে খানিক্ষণ ফণা দোলালো। অবশেষে এমন
ভাবে সরে গেল মনে হল যেন আমায় রাস্তা করে দিচ্ছে। আর কিন্তু বাধা আসেনি।
- গতরাতে এসেই গন্ধ পেয়েছহিলাম, গাঁজাটা এখনো ভালোই টানছিস।
- জানতাম তোমাদের বিশ্বাস হবে না।
- তাহলে চেষ্টা করলি না কেন ভেতরে ঢোকার?
- কি দরকার? কিছু রহস্য, রহস্য
থাকাই ভাল।
এখন আবার সেই জ্ঞানমন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে। সামনে এগনোটা ঠিক হবে কি
হবে না ভাবতে ভাবতে দেখি, বাচ্চা
কোলে ওই মেয়েটা, সিড়ির কয়েকধাপ ওপরে, সাত্যকী
বারবার বারণ করেছিল, কিন্তু আমার এখন আর কোনো ভয়, উদ্বেগ কিছু কাজ করছে না। বরং মাথা চাড়া দিয়েছে অদম্য কৌতূহল। এই সিঁড়ি
বেয়ে উঠে কি আছে? তার চেয়েও বড়, কে এই
কুহকিনী, সাধারণ কেউ না, সাত্যকী
বলেছিল ওদের পরিবারের কেউ ছাড়া এই সিঁড়ি বেয়ে ওঠা অসম্ভব, আর
এই মেয়েটা একটা বাচ্চা কোলে পেছন ফিরে অবলীলায় উঠে চলেছে ওপরে। তবে সাপের
ব্যাপারটা সাত্যকী ভুল বলেনি, সিঁড়ির কোনে কোনে কিলবিল করছে,
নানা প্রজাতির অজস্র সাপ। অন্য সময় হলে আমার পক্ষে এই সিঁড়ি বেয়ে
ওঠা অসম্ভব ছিল, কিন্তু এখন এই মেয়েটা ভরসা দিচ্ছে আমায়,
মরিয়া হয়ে উঠেছি।
নিশ্চয়ই এই জন্যই জায়গাটার নাম কাজলদিঘি। জ্ঞানমন্দিরের ঠিক ওপরে
একটা কালো রঙের দিঘি, সাত্যকীর
যেরকম নিরেট
বলেছিল মোটেই সেরকম নয়। এই কালচে তরলটা
জল নয়, অন্য কিছু,অনেকটা
কাঁচা তেলের মতো লাগছে, এটা কি কোনো তেলে খনি?
দিঘির ঠিক মাঝখান দিয়ে ছোট্টো ছোট্টো তরঙ্গ উঠেছে। সাবধানে এগিয়ে দেখতে যাব, হঠাৎ সেই জল থেকে একটা লোক মাথা তুলল, আমাকে দেখে প্রাণপনে কিছু বলতে চাইল, ঠিক তখনি তার
চারপাশ থেকে একটা কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী ছিটকে উঠে মুহুর্তে তাকে চুবিয়ে দিল দিঘির
নিচে। সেই কুন্ডলীর মধ্যে যেন একটা মুখ দেখতে পেলাম, মুহুর্ত-পরেই
সে ধেয়ে আসল আমার দিকে...।
১০
লোকটা কুকুরটার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত একটা গলায় একটা
কিছু বলে যাচ্ছে, কুকুরটার
ভাবভঙ্গী দেখে মনে হচ্ছে ও সত্যিই লোকটার কথা শুনছে, মাঝে
মাঝে আবার ভুক ভুক করে যেন জবাবও দিচ্ছে। লোকটাকে দেখলে মনে হয় এর বয়স একশ’র বেশি। মুখের চামড়ায় অজস্র ভাঁজ, চোখদুটো কোটরের
অনেক ভেতরে ঢুকে গেছে, বেশিরভাগ দাঁতই আর নেই, যেগুলো আছে, সেগুলোও ক্ষয়ে ক্ষয়ে আর নেই বললেই চলে,
কানগুলো খাড়া খাড়া, গোটা শরীরেই মাংসের অভাব।
সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে একটা চলমান মমি। কথা বলতে গেছিলাম, কিন্তু
কানে শোনেই না বলতে গেলে, আর আমাকেও যা বলল, একটা গোঙানি ছাড়া কিছু মনে হয়নি। কিন্তু অন্যান্যরা নানা ইশারায় পশু-পাখির
সাথে কথা বলার ব্যাপারটা বলতেই সামনের কুকুরটা কে দেকে নিয়ে তার খেল শুরু করে দিল।
মানুষের সাথে কথা আদান-প্রদান করতে পারে না, অথচ গরু-ছাগলের
সাথে কথাবার্তায় সাবলীল --- চিজ বটে একেকটা এখানকার।
শতায়ুর দাবিদার তো আছেই, নব্বইয়ের ঘরে, অথচ দিব্বি
চলে-ফিরে খেটে বেরাচ্ছে, এরকম লোকের সংখ্যাটাও কম না। আমার
সফরসঙ্গী জয় বাবু। জয়দ্রথ গাঙ্গুলি। অসমের একটা কলেজে লোকসংস্কৃতির অধ্যাপক ছিলেন,
এখানে একটা ক্ষেত্রসমীক্ষার কাজে এসে এখানকার লোকেদের সাথে জমে যায়,
অকৃতদার, চাকরি-বাকরি ছেড়েছুড়ে এখানেই এসে
ওঠেন। এখন এখানকার স্থানীয় স্কুলটা চালান। সেই শর্তেই এখানে থাকার অনুমতিও
পেয়েছেন। যা বুঝেছি এখানকার রাজাবাবু বেশ কড়া, বাইরের লোকের
অনুপ্রবেশের ব্যাপারে।
সেই শতায়ু বৃদ্ধ, কুকুরটাকে কি একটা বলাতে, কুকুরটা
দৌড়ে পাশের জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল, আর সেই বৃদ্ধ ধপ করে
মাটিতে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তার নাতি তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে ঘরে নিয়ে গেল।
- কি হল?
- পশু-পাখির সাথে যোগাযোগ করতে গেলে অসম্ভব মনঃসংযোগ লাগে।
অসম্ভব মানসিক শক্তির দরকার। উনি এখন আর অতটা ধকল নিতে পারেন না।
- আপনি এসব বিশ্বাস করেন?
- বিশ্বাস করতে ভালো
লাগে।
কোন জাদুটোনায়, এমনকি শিক্ষিত লোকগুলোও এসব বিশ্বাস আঁকড়ে পড়ে আছে কে জানে! সবটাই কেমন
খুব সাজানো সাজানো লাগছে। এখানকার সবাই যেন আমাকে বোকা বানাবে বলে, একটা বিরাট নাটক করে যাচ্ছে। এমনিতে তো আমাদের বাংলার আর পাঁচটা প্রান্তিক
এলাকার সাথে বিশেষ পার্থক্য নেই। কিন্তু এইসব সরলরেখার মাঝেই যেন কোনো গোপন
অস্বস্তি লুকোনো আছে। যেমন কাল রাতের ঘটনাটাই, আমি জানিই না,
কিকরে নিজের শয়ার ঘরে ফিরে এসেছহিলাম। জ্ঞান ছিল না। অম্বিকা
উপাধ্যায়ের চিকিৎসায় জ্ঞান ফেরে। তাকিয়ে দেখি সাত্যকী, অম্বিকাবাবু,
পল্টন, নীলকান্ত --- এরকম অনেকগুলো চিন্তিত
মুখ।
একটু ধাতস্ত হতেই শুরু হয়েছিল সাত্যকীর ধাতানি।
সাত্যকীকে আগেই অচেনা, অন্যরকম,
অদ্ভূত লেগেছিল ঠিকই, কিন্তু আজ সেই সময়ের
সাত্যকী যেন সম্পূর্ণ অন্য একটা মানুষ।
- আগেই তোমাকে এখানে
আসতে বারণ করেছিলাম, শোনোনি। জানতাম
তোমরা সব শহুরে লোক, কিছু মানবে না। কাল পই পই করে
বললাম, জ্ঞানমন্দিরের কাছাকাছি যাবে না। তাও যেতে হল?
এত কৌতূহল? কিসের এত কৌতূহল তোমার?
আমি তো টোকা মাস্টার। টুকে লিখি। তাও আমার লেখা ছাপতে চাও?
কি মতলবটা কি তোমার?
ঝড়ের মতো এরকম আরো কত কি বলে যাচ্ছিল। থামতেই চাইছিল না। আমি চেষ্টা
করছিলাম কাল রাতের কথাটা খুলে বলতে, শোনার চেষ্টাই ছিল না। শেষে আমি থাকতে না পেরে প্রায় ডুকরে উঠেছিলাম
- ঐ মেয়েটা কে?
এতক্ষণে থেমেছিল সাত্যকী। ওর চোখ দিয়ে তখনও আগুন বেরোচ্ছে।
- লেখা দেব বলেছি, লেখা পাবে। নিয়ে চলে যাবে। বাইরের লোক
আসা মানেই গন্ডগোল।
সটান বেরিয়ে গেছিল। আর দাঁড়ায়নি। ওর সাথে আর সবাইও। আমার খুব খারাপ
লেগেছিল, আমায় বলল বাইরের লোক!
খারাপ লাগাটা কাটিয়েওছে ও। বাইরে আর বেরতেই ইচ্ছে করছিল না। শুয়েই
ছিলাম। হঠাৎ সাত্যকী এল, হাতে
একটা ছিলিম, মুখে হাল্কা হাসি।
- নাকি এক ছিলিম?
তারপর অনেক অনেক দুঃখ-প্রকাশ।
- এখানে অনেক কিছুই ঘটে
যার ব্যাখ্যা করা কঠিন। সেসব না মানিস, জানিস তো যায়গাটা সাপের আড্ডা, প্লিস্,
একা একা আর কোথাও বেরোস না...
একবার ভেবেছিলাম অম্বিকাবাবু নিয়ে আমার সন্দেহের কথা ওকে জানাবো, তারপর ভাবলাম নাঃ এরমধ্যেই জয়বাবু এসে পড়েছিলেন।
তিনজনে একসাথে ব্রেকফাস্ট সারার পর জয়বাবু আর আমি দুজনে বেরিয়েছি কাজলদিঘি ঘুরে
দেখতে। যত দেখছি ভারি অবাক লাগছে, কোথাও কোনো ঝুট-ঝামেলা নেই,
সবাই বেশ হাসি-রসিকতায় মিলিয়ে মিশিয়ে আছে। মহিলা-পুরুষ কাঁধে কাঁধ
মিলিয়ে কাজ করছে। এত নিখুঁত লাগছে যে বারবার মনে হচ্ছে সাজানো।
১১
- সবটাই বুঝলে চয়েসের
ওপর নির্ভর করে। তুমি যেরকম বাছবে, সেইমত ফল পাবে। যা বলার বললাম, এবার বাকিটা
তোমার ওপর।
আমি সঠিক রাস্তাই বেছেছিলাম, এতদিন নিজেকে বারবার বুঝিয়েছি। খারাপ লাগাটাও বারবার ফিরে এসেছে। আমি তো
চুপ ছিলাম, যারা বলেছিল, কত খারাপ ভাবে
যে আঘাত করা যায়, ভাষার ধার কত বুঝিয়ে ছেড়েছিল। মানুষ,
অনেকটা বোধহয় হায়নার মতো, ধৈর্য ধরে অপেক্ষা
করে সূযোগের, আর সেটা এলেই ছিঁড়ে খায় শিকারকে। সাত্যকী তখন
তড়তড়িয়ে উঠছে, ফলে হায়নার অভাব ছিল না।
গতরাতের ঘটনাটা দত্তসাহেবকে জানানোর খুব ইচ্ছে ছিল, সাত্যকীর কাছে বলতেই এককথায় নাকচ করে দিয়েছে। রাতে
খেতে বসে বলেছিলাম। ও আসলে চায় না বাইরের পুলিশ এখানে ঢুকুক। আমি এখন বেশ বুঝতে
পারছি সেই অত বছর আগের ক্ষতটা ওর জুড়ায়নি। বাইরের পৃথিবীটা এখনো ওর কাছে এত
বিভীষিকাময় যে, কাজলদিঘির বাইরের সব কিছুকেই ও বিপদ বলে মনে
করে। আর সেটাই ওর পক্ষে স্বাভাবিক।
রাতের খাওয়ার পর সাত্যকী ওর পেছনে যেতে বলল।
- সাবধানে আসিস, বুঝিসই তো নামেই রাজা, এত বড় বাড়িটা সবসময়
ঠিকঠাক মেরামত হয় না। আর সব জায়গায় আলোও লাগাতে পারি না। দরকারও পড়ে না।
- এখানে ইলেক্ট্রিসিটি কোথা থেকে আসে?
- ও তোকে দেখানো হয়নি, আমাদের নিজেদের জলবিদ্যুৎকেন্দ্র আছে।
- বলিস কি!
- জঙ্গলের ভেতর একটা বেশ ঊঁচু ঝোড়া আছে, ওখানে। ওই প্রফেসর গাঙ্গুলি, উনি তো আসলে এঞ্জিনিয়ার, উনি ব্যাপারটা দেখেছেন,
আমরা সবাই শ্রম দিয়েছি।
- সিরিয়াসলি বলছি, রাজা হিসেবে তুই কিন্তু ফাটিয়ে দিয়েছিস!
- মারব গাট্টা, খালি ফাজলামি।
কথা বলতে বলতে নামছিলাম একটা পুরোনো কাঠের সিঁড়ি দিয়ে, শেষে এসে পৌঁছলাম একটা বড় হলঘরের মতো জায়গায়।
সাত্যকী আলো জ্বালতে দেখি, অনেকগুলো কাঠের পিপে।
- এগুলো কি বল তো?
- কি?
- এটা খোলা আছে, ঢাকনা সরিয়ে দেখ।
ঢাকনা সরাতেই নাকে এল অ্যালকোহলের গন্ধ।
- মদ?
- রাম। সম্ভবত জামাইকান।
আমি ফ্যামিলি হিস্ট্রিতে পড়েছি, আমাদের সাথে ক্যারিবিয়ান পাইরেটদের একটা যোগাযোগ হয়েছিল। খুব
বিস্তারিত কিছু নেই।
তারপর আমরা এক গ্লাস করে জামাইকান রাম নিয়ে উঠে এসেছিলাম প্রাসাদের
ছাদে। এখান থেকে ছায়া-ছায়া গোটা কাজলদিঘিটাই চোখে পড়ছে। একবার চোখ পড়ল
জ্ঞানমন্দিরের দিকে। সবাইকে ছাড়িয়ে মাথা উঁচিয়ে আছে।
- হঠাৎ ছাদে এলি?
- ছাদটা তোকে দেখানো
হয়নি, আর...
থেমে গেল হঠাৎ, ঘুরে দেখি ও আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আমিও তাকালাম। বিরাট বড় আকাশ জুড়ে
একটা তারাময় রেখা, মাঝে মাঝে মেঘ-মেঘ।
- অপূর্ব।
অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে এল।
- ওটা কি বল তো?
ওর গলাটা খুব মায়াবি শোনালো।
- আকাশ-গঙ্গা?
- হুমম্, পৃথিবীর
সব জায়গা থেকে ভালো দেখতে পাওয়া যায় না, কিন্তু
কাজলদিঘির আকাশে রোজ দেখা যায়...
- অসাধারণ দৃশ্য।
- তাই ভাবছিলাম, তুইই বোধহয় ঠিক।
- মানে?
- ঐ যে বলছিলি জ্ঞানমন্দির, আসলে মানমন্দির হতে পারে। ভেবে দেখলাম, হয়তো
আকাশ দেখার জন্যই ঐ উচু জায়গাটা।
- কিন্তু আমি কাল রাতে
- বললাম না, এখানে অনেক কিছু দেখা যায়, শোনা যায়, যা সত্যি ঘটে না।
আর বেশিক্ষন থাকিনি, রামটা দারুন কড়া। ঘরে ফিরে ঘুম লাগিয়েছি।
১২
- আমি আছি তো, ভয় কি?
না মুখ ফুটে বলেনি, মনে হল যেন মাথার মধ্যে বলে উঠল। শেষ একবার ভাবলাম ,গতকালের
ঘটনা আবার ঘটাবো? কিন্তু না, পুরোটা
ঠিক গতকালের মতোও ঘটছে না। কাল আমি কাজলদিঘির কালো তরল স্পর্শ করারই সূযোগ পাইনি,
আজ আমি এখন সেই তরলে নেমেছি, সাঁতার কাটছি।
সেই মেয়েটা আমায় পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
শুরুটা হয়েছিল কালকের মতো করেই, কিন্তু আজ যখন আমি কিছুতেই পা বাড়াচ্ছি না, তখন শুরু
হল দৈহিক জ্বালাতন, চিমটি, কাতুকুতু,
কাঠির খোঁচা...। শেষে বিরক্ত হয়ে মারতে উঠেছিলাম, তারপর পিছু ধাওয়া করতে করতে জ্ঞানমন্দিরের সিঁড়ি, সেখানে
আমি ওর পেছনে উঠতে গেলেই বারে বারে লাথি মেরে ফেলে দিয়েছে, এভাবে
দুই সিঁড়ি উঠে তিন সিঁড়ি পড়ে টড়েও উঠে এসেছি পুরোটা। ওপরে ওঠার পর থেকেই ও যেন
আমার দলে। আমার আর কোনো রাগ বা লালসাও জাগছে না ওর প্রতি। ও আমায় হাত ধরে নিয়ে
যাচ্ছে।
কাজলদিঘির ঠিক মাঝখানটায় এসে গেছি। গতকালের মতো কোনো কালো ধোঁয়ার
কুন্ডলির আবির্ভাব ঘটেনি এখনও। মেয়েটা আমার দুহাত মুঠোয় চেপে ধরে ঘুরতে লাগলো।
শুরুতে আসতে আসতে, ধীরে
ধীরে গতি বাড়িয়ে প্রচন্ড জোরে। শক্ত করে চেপে ধরে আছে আমার মুঠি, নাহলে কেন্দ্রাতীগ বলে কখন ছিটকে যেতাম। আসতে আসতে কাজলদিঘির কালো তরলেও
ঘুর্ণন উঠলো, আমার মাথা ঘুরছে, মনে
হচ্ছে বমি হয়ে যাবে। চিৎকার করে উঠলাম, আর তারপর ওর হাত থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল আমার হাত। ছিটকে পড়লাম একটা শক্ত কোনো জায়গায়, মাথা ঠুকে গেল। সোজা হয়ে বসে দেখি, সাত্যকী, সঙ্গে জয়দ্রথ গাঙ্গুলি।
একটা ডিম্বাকৃতি ঘর, মনে হল শক্ত কাঁচের মতো কিছু দিয়ে তৈরী, হালকা নীল
রঙের। মাঝে একটা উপবৃত্তাকার টেবিলে ছয়জন বসে। দেখে মনে হচ্ছে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
প্রত্যেকের হাত টেবিলের ওপর রাখা, প্রত্যেকের তালু পাশের
জনের তালু ছুঁয়ে আছে। আর টেবিলের মাঝখানে একটা ডিম্বাকৃতি জিনিস, যার গায়ে সোনালি আগুন জ্বলছে। কি করছে ওরা? প্ল্যানচেট?
আমি এমন একটা কোনে পড়েছি, ওরা আমায় দেখতে
পায়নি। প্রফেসর গাঙ্গুলি, একটা মনিটরের সামনে কিসব খুটখাট
করছেন, আমার দিকে পেছন ফেরা। সাত্যকীর দিকে তাকালাম, ওর মুখে একটা সমাহিত ভাব, চোখটা আধখোলা। আর যাই হোক
সাত্যকী আছে এখানে, সেই ভরসায় বেরিয়ে এলাম, ভেবেছিলাম চমকে দেব।
- কি হচ্ছে এসব? হ্যাঁ?
জয়দ্রথ ঘুরে দাঁড়িয়েছে, সাত্যকীর সমাহিত ভাবটাও আর নেই। দুজনের কেউ কিন্তু এতটুকু বিচলিত হল না।
- তোমায় এখানে আসতে বারণ
করেছিলাম। কেন অবাধ্য হলে?
ওর মধ্যে কোনো রাগ নেই, বরং কেমন যেন হতাশা।
- তুই এসব করছিস? আর আমি ভেবেছিলাম... কি করছিস এসব? তন্ত্র-মন্ত্র?
- তন্ত্র মন্ত্র? হাঃ হাঃ হাঃ, পড়াশনা করছি? তোকে যে লেখাটা দেব, সেটার কাজ করছি।
- পড়াশোনা?
মনে পড়ে গেল বেমানান-এর কথা, ছয়জন অদ্ভূত চরিত্র, দুর্নীতিপরায়ণ ডাক্তার, আত্মহত্যাকামী ধর্ষিতা, হতাশ তরুন রাজনীতিক, মাঝবয়েসী রূপান্তরকামি সোশালাইট, জঙ্গী হতে চেয়ে ঘর
ছাড়া কিশোর আর এক বুড়ো অন্ধ ভিখারি। টেবিলে যে ছজন বসে আছে, তাদেরকে
এসব চরিত্রে দারুন মানিয়ে যাবে। আমার বুকের ধড়ফড়ানি বাড়ছে।
- পরের পার্টে একটা নতুন চরিত্র ঢোকাবো ভেবেছিলাম। বিকিয়ে
যাওয়া কবি, বেশ মানাবে,
কি বলিস?
- এরা কি মৃত? মেরে ফেলেছিস?
- মৃত? কি বলছিস? অরা
কোমায় আছে বলতে পারিস, ইন্ডিউস্ড কোমা। এই ছ’টা ব্রেইন একটা সিমুলেটেড রিয়েলিটির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, সিচুয়েশনগুলো আমার তৈরী করা।
তারপর একটু মুখ বেঁকিয়ে হাসল,
- খুব তাড়াতাড়ি তুইও ওদের সাথে যোগ দিবি।
- কিন্তু কেন সাত্যকী, তুই এত ভালো লিখিস, এসব তন্ত্রসাধনার তোর কি দরকার?
সাত্যকী যেন মাঝখানের দূরত্বটা উড়ে এল, আমার কলারটা খামচে ধরেছে, ওর
বুড়ো আঙ্গুলের নখ ঢুকে যাচ্ছে আমার গলার চামড়ায়।
- কি তখন থেকে
তন্ত্র-মন্ত্র করে যাচ্ছিস? যৌনতায়
অক্ষম পুরুষদের দেখেছিস? জানিস তাদের কষ্ট? আমায় দেখ, দেখ, আমায় দেখ।
শালা জোর করে আমায় দিয়ে অনুবাদ করালো, না জানিয়ে আমার
নামে ছেপে দিল, আর ঐ বাচ্চা মেয়েটাকে দিয়ে এফবি-তে...কত
কি বলেছিল...কি কি সব বলেছিল...উঃ মাগো! কি নোংরা...কি ঘেন্না।
সাত্যকীর সাড়া শরীর থর-থর কাঁপছে, ঝড় ঝড় করে জল পড়ছে চোখ দিয়ে, আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
আমারো খুব কান্না পাচ্ছে।
- গুটিয়ে এইটুকু হয়ে গেছিলাম, কারোর হাঁটুর ওপর তাকাতে পারতাম না, রাস্তায়
বেরোতে পারতাম না। মনে হত সবাই আঙুল তুলে দেখাচ্ছে।
- আয়াম রিয়েলি সরি রে, সব জেনেও কিছু করিনি।
- কি করবি তুই? যা করার আমাকেই করতে হত। ভেবেছিলাম, ঐ শালা কালিপদর
মুখ থেবরে দেব, এমন লিখব। পাবলিক তো জানি, সেরম লিখলে আর মনে রাখবে না আগের কথা, কেউ বলবে
না টোকা মাস্টার। কিন্তু লিখতে পারি না রে, আমি লিখতে
পারি না, একলাইন লিখতে পারি না। যাই লিখতে যাই মনে হয়
টুকছি, টুকছি। লেখা চলে গেছে আমার থেকে। কিচ্ছু লিখতে
পারি না আমি। কিচ্ছু না। সাদা কাগজে দাগ কাটি আর ছিঁড়ে ফেলি।
- কিন্তু তাই বলে,
- আমি আর টুকি না, দেখ, সব অরিজিনাল, সব
নতুন। এই মেশিনটা, এই মেশিনটা ওরা আমায় বানিয়ে দিয়েছে,
কোনো কষ্ট পাচ্ছে না কিন্তু ওরা, কেবল
গল্প বলছে আমায়। ওদের গল্প, নিজেদের জীবনের গল্প। আমায়
বলে, বইয়ের মতো মেলে ধরে আমার সামনে। আমি খুঁজে খুঁজে
তুলে আনি, সংগ্রহ করি, সবার জীবনে
গল্প থাকে, কত গল্প, সেসব মিলিয়ে
মিশিয়ে লিখি। আগের কোনো গল্পের সাথে মিল পাবি না। অবশ্য তুই জানবি কি করে?
তুই কি আর সব পড়েছিস? আমি পড়েছি। পৃথিবীর
সব গল্প-উপন্যাস আমি পড়েছি।
- তুই পাগল হয়ে গেছিস, এসব বন্ধ কর। কি বলছিস, সব পড়েছিস?
- না পার্থবাবু, এই মন্দিরের নাম এমনি এমনি জ্ঞান মন্দির না, এই
মন্দিরে এই পৃথিবীর সব জ্ঞান রয়েছে। উপযুক্ত মানুষ দরকার মতো জ্ঞানলাভ করে।
- আমি পড়েছি, গত পঁচিশ বছর ধরে সব পড়ে শেষ করেছি, তারপর আবার
লিখছি, আর কেউ বলতে পারবে না আমি টুকে লিখি।
- আমি এলেখা নিতে পারবো না।
- হাঃ হাঃ হাঃ, চমৎকার তোর রসবোধ, তুই কি ভাবছিস এতকিছু জেনে
তুই কোলকাতায় ফিরে যাবি? এই জ্ঞানমন্দিরে ঢোকা কঠিন,
বেরনো তো সম্ভবই না।
- কে আটকাবে আমায়? তুই?
জানি না কোথা থেকে আমি এত কথা বলছি, মোটামুটি বুঝতে পারছি এই সাইকোপ্যাথদের হাত থেকে
ছাড়া পাওয়া মোটেই সহজ হবে না। তবে সাত্যকী বরাবরই খুব আবেগপ্রবণ, একটু ফেসবুক বুলিং-এই তাই পুরো ধ্বংস হয়ে গেছিল। ওখানেই আঘাত করার চেষ্টা
করতে হবে। কিন্তু সব ভাবনা পরিকল্পনা ভেস্তে গে।, কালকের সেই
কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী, একটা নয়, দুটো।
ক্রমশঃ মূর্ত হচ্ছে। এ কী! কুমুদ কুমার দত্ত আর নীলকান্ত মেথর। আমার দু’কাধ শক্ত করে চেপে ধরেছে, আমি একবার ছাড়াবার চেষ্টা
করে দেখলাম, সামান্য নড়তেও পারছি না।
- তোমরাও কি বুড়ো হয়ে যাচ্ছ নাকি? ও ঢুকল কিকরে এখানে?
- দুঃখিত রাজাবাবু।
কিন্তু আমাদের চোখে পড়েনি।
ওরা মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে।
- কারণ না থাকলে কেউ এই
মন্দিরে ঢুকতে পারে না মহারাজ। যক্ষদের ওপর রুষ্ট হবেন না। হয়তো মা
রুদ্রচন্ডিই ওকে পাঠিয়েছেন।
অম্বিকা উপাধ্যায়ের প্রবেশ। এই লোকটাই নাটের গুরু। ওকে দেখেই আমার
চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
- সাত্যকী এই লোকটা তোকে
ভুল মমমম...
নীলকান্ত তার লিকলিকে হাত দিয়ে আমার মুখ চেপে ধরেছে।
- চুপ কর, উনি আমাদের কূলগুরু। আমার গল্পের গল্পের
চরিত্র হওয়াই তোমার ভবিতব্য। ওকে গ্রীডে সংযুক্ত করো।
আমি ওদের হাত ছাড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করলাম, কিন্তু না, ওদের শক্তির কাছে,
আমি কিছুই না।
- থামো, ওকে আমি এনেছি, ও
আমার।
সেই মেয়েটি। গা’য়ে একটুকরো কাপড় নেই।
তাকে দেখে সবাই হাতজোড় করে নমস্কার করলো। সাত্যকী এগিয়ে গেল। মেয়েটার
ঠোঁটে একটা চুমু খেল।
- ও কিকরে হবে? ও যে অশুদ্ধ।
মেয়েটা আবার আগের মতো খিলখিল করে হেসে উঠল।
- অশুদ্ধ না হলে শোধন
হবে কিসের? আর শুদ্ধ-অশুদ্ধ
এসব তো পথ, কোনো জায়গা নয়, যে
পৌঁছে গেলে, এ রাস্তায় চলতে হবে, এগোতে
হবে। এই যে তোমার বিখ্যাত হওয়ার লোভ --- এখনো তো গেল না, আমি কি তোমায় বারণ করছি? একদিন দেখবে আর ইচ্ছেটাই
নেই। এস, আমার কাছে এস।
মেয়েটি এগিয়ে গেল আগুনের দিকে, একটা উজ্জ্বল সোনালী আগুন। সাত্যকী পেছনে যেতে থাকল, এক এক করে খসে পড়ল তার পোশাক, চামড়া, আমার মনে পড়ল দেবী রুদ্রচন্ডীর বিগ্রহের কথা। আমিই কি ধাঁধার শেষ টুকরো?
আমার আর পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। এক অদ্ভূত শান্তি, এমনটা আমি আগে অনুভব করিনি।
মেয়েটা হাসি মুখে আমার দিকে হাত বাড়ালো। আমি এগোতে থাকলাম, আমার সব বাস্তব, আমার সব
যুক্তি, যা এতদিন জানতাম পালটে যাচ্ছে মুহুর্তের মধ্যে।
ততক্ষণে সাত্যকী পেঁচিয়ে গিয়েছে দেবীর শরীরে, মুখ দিয়েছে তার
স্তনে।
১৩
- আপনি তো এখানকার লোক নন।
- না স্যার।
- বদলি হয়ে এসেছেন।
- হ্যাঁ স্যার। বদলি হল কেন?
- আপনি তো জানেনই স্যার, এইসব পলিটিকাল পার্টি। একদলের হয়ে কাজ করতাম, ভালোই
চলছিল, ভোটে হেরে গেল। নতুন দল এল। ব্যাস...বদলি।
- হ্যাঁ, ঠিক
এতাই বলছি, আবার এক ভুলের জন্য এখানেই থেকে যেতে হবে
সারা বছর, সেটা কি চান?
- না স্যার, আমি সোদপুরের ছেলে।
- হুমম্। তাই বলছি চেপে যান।
- চেপে যাব? মানে উনি তো সেলিব্রিটি, কোলকাতার চাপ আসবে।
- আসুক, আরে
এসব রাজা-রাজরাদের ব্যাপার, আমি আপনি উলুখাগরা, কেন বেকার প্রাণ দেব?
- তাহলে স্যার কেসটা ক্লোজ করে দিই?
- মানে?
- ঐ ধরুন লুঠেরারা মেরে পুঁতে দিয়েছে।
- কোনো এভিডেন্স আছে? লাশ পেয়েছেন?
- না স্যার।
- আপনার তো চাকরিটাই যাবে দেখছি।
- তাহলে স্যার?
- সাত-আট মাস তো হল, কটা নিখোঁজ কেসের মীমাংসা হয়েছে বলুন তো?
- খুব কম।
- ব্যাস, এখানে
এত জলা জঙ্গল, হারিয়ে গেলে কিভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে?
- তাহলে স্যার এই কেসটাও...
- অমীমাংসিত।

No comments:
Post a Comment