একটি হাফ মার্ডার কেস
![]() |
শিল্পী:অর্পণ ঘোষ
|
চোখ কচলে
নিয়ে ঋক ঘড়িটা দেখে নিলো। ৬ টা ১৮ মিনিট। অর্থাৎ, আর ঠিক ১৪ মিনিট সময় হাতে। আর ঠিক
১৪ মিনিট পরে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। তারপর সেই ঘনায়মান রক্তপদ্মের অস্তিত্ব স্রেফ আড়াই
মিনিট। বাথরুমে গিয়ে ব্রাশ করার সাথে সাথে ছুরিটাকে উল্টে পাল্টে দেখে নিলো ঋক। নেপালি
একটা কুকরি, যেটা তাকে দিয়েছিলো বছর তিনেক আগে স্বর্গারোহিনী পর্বতের এক সাধু। সেই
থেকে প্রতিদিন নিজের সন্তানের মতো সেটাকে লালন করেছে সে। প্রতিদিন নিজের শিয়রে ওই কুকরিটা
নিয়ে সে অর্ধচন্দ্রাকার এক ঘুমের ভেতরে প্রবেশ করে। এক একটা ঘর এক একটা বারান্দা পেরিয়ে
ক্রমশঃ অন্দরমহলে প্রবেশ করে। সেখান থেকে একটি নতজানু পৈতে তুলে সে একটি কুকরির উপনয়ন
সম্পন্ন করছে এমন এক স্বপ্ন আসে প্রতিদিন।
জায়গাটা নেতারহাট। কোনো খুনের মোটিভ নিয়ে সেখানে আসেনি ঋক। এসেছিলো সাধারণ এক ট্যুরিষ্টের মতোই। যেভাবে গত পাঁচ বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছে সে। অবশ্য এই পরিব্রাজকের ডান আস্তিনে লুকিয়ে রাখা ছিল একটি অতলস্পর্শী দীঘির কথা। যার অনেক অনেক নিচে একটি লুডোর কৌটোর মধ্যে রাখা ছিল একটি নিষ্পাপ খুনের শঙ্খমুখী ভালোলাগা। অর্থাৎ, একটি আপাত নাতিশীতোষ্ণ ভ্রমণের মাঝে একটি অবচেতন খুঁজছিলো একটি পারফেক্ট মার্ডারের গন্ধ। রাতের পর রাত ঋকের কেটে গেছে তার অবচেতনে বসবাস করা দুটি চরিত্রের দ্বন্দ্বমূলক কথোপকথনে। একটি পুরুষ ও একটি নারী চরিত্র। যখন পুরুষ মাথা থেকে সিলিঙের দূরত্ব নিয়ে সন্দিহান হয়ে ওঠে, তখন নারী কুলুঙ্গিতে ফেলে রাখা দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত একটি ফুলের সাজি নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্বপ্নখণ্ডগুলি জমা করে। যখন নারী সাঁতলে নেওয়া ডালের মধ্যে জিরে ফোড়ন দিতে উদ্যত হয়, তখন পুরুষ বাড়ির পেছনে বাগানে একটি বিছুটি গাছের পাতাকে স্পর্শ না করে তার কত সামনে জিভ নিয়ে যাওয়া যায় সেই খেলায় মেতে থাকে। যেভাবে ভ্রমণ ও খুনের মতো দুটি বিপরীত মেরুতে বসে দুটি সত্ত্বা এই আপাত বিপদহীনতায় সমুদয় মৃত্যু উপত্যকার সম্ভবনা তৈরী করে।
৬ টা ২১ মিনিট ঘড়িতে। সময় খুব অল্প। একটি সূর্যোদয়ের অপেক্ষা ও তার স্থায়িত্বের লগ্নময়তা। যে স্থায়িত্বে একটি লবেজান খুন পবিত্রতার কূটনৈতিকতায় জড়িয়ে পড়বে। তার সাথে অপেক্ষা আর একটি অর্ধসমাপ্ত জীবনকাহিনীর। যার আরেকটি মৃত্যুর দরকার ছিল। একটি মৃত্যু তার যথেষ্ট ছিলোনা। যে অর্ধ-মৃত্যু সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়েনা অথবা যে মৃত্যু কবরস্থ হবার পরেও ফুলের গন্ধে ঈশান কোণে একটি নারীর চুম্বনের উৎসস্থল খুঁজতে উদ্যত হয়। ঋকের চোখে ধরা পড়েছিল এই অর্ধ-মানুষের অস্তিত্ব। নেতারহাটে এসে যে বাংলোটায় সে উঠেছিল সেটা অনেক পুরোনো, ব্রিটিশ আমলের। ঋক ছাড়া সারা বাংলোতে মানুষ বলতে পাঁচজন। কেয়ারটেকার ইয়াসিন থাকতো একটা ছোট্ট ঘরে। তার লাগোয়া একটি রান্নাঘর। সেখানেই পুরোনো একটা এফ.এম রেডিও নিয়ে দিনের বেশিরভাগ সময়টা কাটাতো রাঁধুনি শঙ্কর সিং। আর আউটহাউসে থাকতো শঙ্করের স্ত্রী কৌশল্যা ও দুই মেয়ে। দুই মেয়ে সারাদিন তাদের উঠোনে পোষা মুরগীগুলিকে নিয়ে খেলা করতো। খুব সাধারণ দেহাতি ধাঁচের শারীরিক গড়ন হলেও তার সাথে মনে রাখার মতো ছিল তাদের চুলের সোনালী আভা। অবশ্য অর্ধ-মানুষের অস্তিত্ব তখনও ঋকের কাছে প্রতীয়মান হয়ে ওঠেনি। আশ্চর্যের ব্যাপার এতদিন থাকার পরও কেয়ারটেকার ইয়াসিন বুঝতে পারেনি তার কথা। অবশ্য কথায় কথায় সে বলে ফেলে বাংলোর সাথে জড়িয়ে থাকা একটি সাহেবের মৃত্যুর কথা। তার নাম ছিল স্যামুয়েল জোহান্স। সাহেব আজ থেকে অনেক বছর আগে একটি বজ্রপাতের ঘটনায় বাংলোর একটি ঘরে বসে মারা যান।
বাংলোয় ঢোকার পর থেকে একটি চাপা অস্বস্তি ক্রমশঃ ঋককে গ্রাস করতে থাকে। ব্যাগের ছোট চেনটায় হাত ঢুকিয়ে দুটো ট্যাবলেট গলাধঃকরণ করে সে। চিন্তারেখাগুলিকে সমবিন্দু করে তোলার চেষ্টা করে। প্রথম ইঙ্গিত ঋক পায় তার অবচেতনের চরিত্রগুলির আকস্মিক পরিবর্তনে। পুরুষটি সেদিন পরিপাটি চুল আঁচড়ে একটি অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় পেঁয়াজ, লঙ্কা ও পান্তাভাত সাজিয়ে বসেছিল। আর নারীটি তার একাদশীর উপোষ ভেঙে দাওয়ায় বসে গোটা একটা রুইমাছ কাঁচা চিবোচ্ছিলো। পুরুষটি দূরের মেলায় যাচ্ছিলো সাইকেলে করে লাল মাটির রাস্তা ধরে। তার মস্তিষ্কে রাখা ছিল একটি বেলুন ও অসংখ্য নাগরদোলার স্মৃতি। নারী রাতের গোপন প্রহরে একটি তেঁতুল গাছের নিচে বসে একটি ছাগলের চামড়ার কাঁথা বুনছিলো। ঋকের মনে পড়লো স্বর্গারোহিনী পর্বতের সেই সাধুর কথা। যে বলেছিলো, "তোমাকে এই কুকরির সাথে দুটি চরিত্র দিলাম। এই দুটি চরিত্র তোমার কুকরির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। যেদিন দেখবে এই চরিত্রগুলো ওলোটপালোট হয়ে গিয়েছে, সেদিন বুঝবে একটি অর্ধ-মানুষ তোমার স্মৃতির সূত্রে ঢুকে পড়তে চাইছে। তখন একটি খুন তোমায় করতে হবে। ভয় পেয়োনা, অর্ধ-মানুষ কে মুক্তি দেবার এই প্রক্রিয়াটি তোমার হাতে সপেঁ দিলাম আজ। যে মানুষগুলি মানুষ হয়েও দৃশ্যমান নয় অথবা যে মানুষগুলির ক্ষুধা তৃষ্ণা কাম সব থাকলেও তাদের অস্তিত্ব কেউ বুঝতে পারেনা, তাদের দেখতে ও বুঝতে পারার অন্তর্যাতায়াত ক্ষমতা তোমায় দিলাম আমি। মনে রেখো, এ ক্ষমতা তোমার একার না। অনেক মানুষ জন্মসূত্রে এ ক্ষমতালব্ধ হয়। কিন্তু তেমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে খুব কম। এই ক্ষমতা যার থাকে সে অর্ধ-মানুষদের সাথে সাধারণ মানুষের মতোই সবকিছু করতে পারে।"
সন্দেহ বিশ্বাসে পরিণত হলো যখন ব্যালকনিতে উত্তুরে আদর মেখে নিতে নিতে রাতের আলোয় সে স্পষ্ট দেখতে পেলো শঙ্কর সিং এর বৌ কৌশল্যা আউটহাউস থেকে ত্রস্তপদে এগিয়ে গেলো সেই ঘরটিতে যেখানে স্যামুয়েল সাহেব এর মৃত্যু হয়েছিল। একটি যৌনতার মহুয়া ফুলের ভেতর একটি ভিনদেশী মৌমাছি অন্তর্লীন হলো। ডাকবাংলোর সাদা ছাদে তখন জ্যোৎস্নার ছায়ানট। অথবা তার ফুলেল অলিন্দে একটি আসন্নপ্রসবা জ্যাজ সংগীত গুলে যাচ্ছে সমকালীন কোনো হুইস্কির গ্লাসে। ঋকের কাছে পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেলো। একটি অর্ধ-মানুষ, তার সাথে একটি মানুষের ভালোবাসা, কৌশল্যার জন্মসূত্রে পাওয়া ক্ষমতা ও দুই মেয়ের সোনালী চুলের রং। ঋক বুঝতে পারল সময় এসেছে একটি নিস্তব্ধ খুনের। যদিও এ মৈথুনে সে নিষ্পৃহ, কিন্তু সাধুর কথা তাকে রাখতেই হবে। ঋক শেষ পেগটা একটা টবের পাতাবাহার গাছের গোড়ায় ঢেলে দিয়ে শুতে চলে গেলো। মনে মনে ভেঁজে নিলো একটি সূর্যোদয়কালীন খুনের পরিকল্পনা।
৬ টা বেজে ২৬ মিনিট। ঋক এগিয়ে চলেছে বাংলোর ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। সে জানে ওখানেই সে খুঁজে পাবে স্যামুয়েল সাহেবকে। একটি আপাদমস্তক একমাত্রিক সকাল পবিত্র হয়ে উঠবে একটি অর্ধ-মানুষের রক্তে। আচ্ছা, অর্ধ-মানুষের রক্তের রং কি ? সে রক্তের কি কোনো গন্ধ আছে ? সে রক্ত কি একটি আততায়ীকে আকুল করে তোলে ? অথবা খুনীর মধ্যে জেগে ওঠে আত্মহত্যাপ্রবণতা ? ঋক বুঝতে পারলো ক্রমশঃ তার ভেতরের খুনী সত্ত্বাটা চিড়বিড় চিড়বিড় আওয়াজ করছে। যে আওয়াজ শোনা যায় অনেক উঁচু হাইটেনশান লাইনের নিচে। এক ধরণের মৃত্যুসংগীত লেখা হয়ে থাকে ওই ধরণের সুরে।
সিঁড়ি বেয়ে আস্তে আস্তে উপরে উঠলো ঋক। এই পথটুকু যেন মনে হচ্ছিলো হাজার হাজার মাইল। সাহেবকে দেখতে পেলো সে। সাহেব গলায় বাইনোকুলার ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আর একটি অভূতপূর্ব সূর্যোদয়ে ছেয়ে যাচ্ছে পাহাড়গুলি। এক মুহূর্ত ভাবলো ঋক কুকরিটা হাতে নেবার আগে। মনে পড়ে গেলো সেই সাধুর মুখ। সাহেব কিছু বুঝতে পারার আগেই ঋক কুকরিটা ঢুকিয়ে দিল একটা না-ফাঁপা না-ভরাট মেরুদণ্ডের পাশে। অবশ্য তক্ষুনি একটা সমান্তরাল মৃত্যু অনুভব করলো সে। তার পিঠের কাছটায় একটা ছুরি শরীরটাকে এস্পার ওস্পার করে বেরিয়ে গেছে। কৌশল্যা দাঁড়িয়ে ছুরি হাতে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পড়তে ঋক বুঝতে পারলো, সাহেবকে খুন করার সময় সে ছিল এক অর্ধ-মানুষ। গত রাত্রেই তার অর্ধ-মৃত্যু ঘটেছে দশ নম্বর এন-১০ ট্যাবলেটটা খাওয়ার পর, ঘুমের মাঝে। সে অর্ধ-মৃত্যুর গন্ধ পৌঁছেছে জন্মসূত্রে অন্তর্যাতায়াত ক্ষমতাপ্রাপ্ত কৌশল্যার কাছে। তাই কৌশল্যাকে তার বরাদ্দ খুনটা করতে হয়েছে। প্রশ্নটা হলো সাহেবকে হত্যা করার ভার কেন কৌশল্যা নিলোনা ?
একটি ব্লুজ গান মনে পড়লো ঋকের। স্প্যানিশ গান। যার তর্জমা করলে এমনটা দাঁড়ায়, "ভালোবাসার মানুষকে মারার কর্তব্য আমায় দিওনা। আমি আত্মহত্যায় সুখী হবো।" চোখ ফিরিয়ে দেখলো ঋক, সূর্যের শেষ ফালিটুকু পাহাড়ের আড়াল থেকে উঠতে উঠতে কিভাবে কৌশল্যার দেহখানি ওয়াচটাওয়ারের ওপর থেকে মাটি স্পর্শ করলো।
জায়গাটা নেতারহাট। কোনো খুনের মোটিভ নিয়ে সেখানে আসেনি ঋক। এসেছিলো সাধারণ এক ট্যুরিষ্টের মতোই। যেভাবে গত পাঁচ বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছে সে। অবশ্য এই পরিব্রাজকের ডান আস্তিনে লুকিয়ে রাখা ছিল একটি অতলস্পর্শী দীঘির কথা। যার অনেক অনেক নিচে একটি লুডোর কৌটোর মধ্যে রাখা ছিল একটি নিষ্পাপ খুনের শঙ্খমুখী ভালোলাগা। অর্থাৎ, একটি আপাত নাতিশীতোষ্ণ ভ্রমণের মাঝে একটি অবচেতন খুঁজছিলো একটি পারফেক্ট মার্ডারের গন্ধ। রাতের পর রাত ঋকের কেটে গেছে তার অবচেতনে বসবাস করা দুটি চরিত্রের দ্বন্দ্বমূলক কথোপকথনে। একটি পুরুষ ও একটি নারী চরিত্র। যখন পুরুষ মাথা থেকে সিলিঙের দূরত্ব নিয়ে সন্দিহান হয়ে ওঠে, তখন নারী কুলুঙ্গিতে ফেলে রাখা দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত একটি ফুলের সাজি নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্বপ্নখণ্ডগুলি জমা করে। যখন নারী সাঁতলে নেওয়া ডালের মধ্যে জিরে ফোড়ন দিতে উদ্যত হয়, তখন পুরুষ বাড়ির পেছনে বাগানে একটি বিছুটি গাছের পাতাকে স্পর্শ না করে তার কত সামনে জিভ নিয়ে যাওয়া যায় সেই খেলায় মেতে থাকে। যেভাবে ভ্রমণ ও খুনের মতো দুটি বিপরীত মেরুতে বসে দুটি সত্ত্বা এই আপাত বিপদহীনতায় সমুদয় মৃত্যু উপত্যকার সম্ভবনা তৈরী করে।
৬ টা ২১ মিনিট ঘড়িতে। সময় খুব অল্প। একটি সূর্যোদয়ের অপেক্ষা ও তার স্থায়িত্বের লগ্নময়তা। যে স্থায়িত্বে একটি লবেজান খুন পবিত্রতার কূটনৈতিকতায় জড়িয়ে পড়বে। তার সাথে অপেক্ষা আর একটি অর্ধসমাপ্ত জীবনকাহিনীর। যার আরেকটি মৃত্যুর দরকার ছিল। একটি মৃত্যু তার যথেষ্ট ছিলোনা। যে অর্ধ-মৃত্যু সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়েনা অথবা যে মৃত্যু কবরস্থ হবার পরেও ফুলের গন্ধে ঈশান কোণে একটি নারীর চুম্বনের উৎসস্থল খুঁজতে উদ্যত হয়। ঋকের চোখে ধরা পড়েছিল এই অর্ধ-মানুষের অস্তিত্ব। নেতারহাটে এসে যে বাংলোটায় সে উঠেছিল সেটা অনেক পুরোনো, ব্রিটিশ আমলের। ঋক ছাড়া সারা বাংলোতে মানুষ বলতে পাঁচজন। কেয়ারটেকার ইয়াসিন থাকতো একটা ছোট্ট ঘরে। তার লাগোয়া একটি রান্নাঘর। সেখানেই পুরোনো একটা এফ.এম রেডিও নিয়ে দিনের বেশিরভাগ সময়টা কাটাতো রাঁধুনি শঙ্কর সিং। আর আউটহাউসে থাকতো শঙ্করের স্ত্রী কৌশল্যা ও দুই মেয়ে। দুই মেয়ে সারাদিন তাদের উঠোনে পোষা মুরগীগুলিকে নিয়ে খেলা করতো। খুব সাধারণ দেহাতি ধাঁচের শারীরিক গড়ন হলেও তার সাথে মনে রাখার মতো ছিল তাদের চুলের সোনালী আভা। অবশ্য অর্ধ-মানুষের অস্তিত্ব তখনও ঋকের কাছে প্রতীয়মান হয়ে ওঠেনি। আশ্চর্যের ব্যাপার এতদিন থাকার পরও কেয়ারটেকার ইয়াসিন বুঝতে পারেনি তার কথা। অবশ্য কথায় কথায় সে বলে ফেলে বাংলোর সাথে জড়িয়ে থাকা একটি সাহেবের মৃত্যুর কথা। তার নাম ছিল স্যামুয়েল জোহান্স। সাহেব আজ থেকে অনেক বছর আগে একটি বজ্রপাতের ঘটনায় বাংলোর একটি ঘরে বসে মারা যান।
বাংলোয় ঢোকার পর থেকে একটি চাপা অস্বস্তি ক্রমশঃ ঋককে গ্রাস করতে থাকে। ব্যাগের ছোট চেনটায় হাত ঢুকিয়ে দুটো ট্যাবলেট গলাধঃকরণ করে সে। চিন্তারেখাগুলিকে সমবিন্দু করে তোলার চেষ্টা করে। প্রথম ইঙ্গিত ঋক পায় তার অবচেতনের চরিত্রগুলির আকস্মিক পরিবর্তনে। পুরুষটি সেদিন পরিপাটি চুল আঁচড়ে একটি অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় পেঁয়াজ, লঙ্কা ও পান্তাভাত সাজিয়ে বসেছিল। আর নারীটি তার একাদশীর উপোষ ভেঙে দাওয়ায় বসে গোটা একটা রুইমাছ কাঁচা চিবোচ্ছিলো। পুরুষটি দূরের মেলায় যাচ্ছিলো সাইকেলে করে লাল মাটির রাস্তা ধরে। তার মস্তিষ্কে রাখা ছিল একটি বেলুন ও অসংখ্য নাগরদোলার স্মৃতি। নারী রাতের গোপন প্রহরে একটি তেঁতুল গাছের নিচে বসে একটি ছাগলের চামড়ার কাঁথা বুনছিলো। ঋকের মনে পড়লো স্বর্গারোহিনী পর্বতের সেই সাধুর কথা। যে বলেছিলো, "তোমাকে এই কুকরির সাথে দুটি চরিত্র দিলাম। এই দুটি চরিত্র তোমার কুকরির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। যেদিন দেখবে এই চরিত্রগুলো ওলোটপালোট হয়ে গিয়েছে, সেদিন বুঝবে একটি অর্ধ-মানুষ তোমার স্মৃতির সূত্রে ঢুকে পড়তে চাইছে। তখন একটি খুন তোমায় করতে হবে। ভয় পেয়োনা, অর্ধ-মানুষ কে মুক্তি দেবার এই প্রক্রিয়াটি তোমার হাতে সপেঁ দিলাম আজ। যে মানুষগুলি মানুষ হয়েও দৃশ্যমান নয় অথবা যে মানুষগুলির ক্ষুধা তৃষ্ণা কাম সব থাকলেও তাদের অস্তিত্ব কেউ বুঝতে পারেনা, তাদের দেখতে ও বুঝতে পারার অন্তর্যাতায়াত ক্ষমতা তোমায় দিলাম আমি। মনে রেখো, এ ক্ষমতা তোমার একার না। অনেক মানুষ জন্মসূত্রে এ ক্ষমতালব্ধ হয়। কিন্তু তেমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে খুব কম। এই ক্ষমতা যার থাকে সে অর্ধ-মানুষদের সাথে সাধারণ মানুষের মতোই সবকিছু করতে পারে।"
সন্দেহ বিশ্বাসে পরিণত হলো যখন ব্যালকনিতে উত্তুরে আদর মেখে নিতে নিতে রাতের আলোয় সে স্পষ্ট দেখতে পেলো শঙ্কর সিং এর বৌ কৌশল্যা আউটহাউস থেকে ত্রস্তপদে এগিয়ে গেলো সেই ঘরটিতে যেখানে স্যামুয়েল সাহেব এর মৃত্যু হয়েছিল। একটি যৌনতার মহুয়া ফুলের ভেতর একটি ভিনদেশী মৌমাছি অন্তর্লীন হলো। ডাকবাংলোর সাদা ছাদে তখন জ্যোৎস্নার ছায়ানট। অথবা তার ফুলেল অলিন্দে একটি আসন্নপ্রসবা জ্যাজ সংগীত গুলে যাচ্ছে সমকালীন কোনো হুইস্কির গ্লাসে। ঋকের কাছে পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেলো। একটি অর্ধ-মানুষ, তার সাথে একটি মানুষের ভালোবাসা, কৌশল্যার জন্মসূত্রে পাওয়া ক্ষমতা ও দুই মেয়ের সোনালী চুলের রং। ঋক বুঝতে পারল সময় এসেছে একটি নিস্তব্ধ খুনের। যদিও এ মৈথুনে সে নিষ্পৃহ, কিন্তু সাধুর কথা তাকে রাখতেই হবে। ঋক শেষ পেগটা একটা টবের পাতাবাহার গাছের গোড়ায় ঢেলে দিয়ে শুতে চলে গেলো। মনে মনে ভেঁজে নিলো একটি সূর্যোদয়কালীন খুনের পরিকল্পনা।
৬ টা বেজে ২৬ মিনিট। ঋক এগিয়ে চলেছে বাংলোর ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। সে জানে ওখানেই সে খুঁজে পাবে স্যামুয়েল সাহেবকে। একটি আপাদমস্তক একমাত্রিক সকাল পবিত্র হয়ে উঠবে একটি অর্ধ-মানুষের রক্তে। আচ্ছা, অর্ধ-মানুষের রক্তের রং কি ? সে রক্তের কি কোনো গন্ধ আছে ? সে রক্ত কি একটি আততায়ীকে আকুল করে তোলে ? অথবা খুনীর মধ্যে জেগে ওঠে আত্মহত্যাপ্রবণতা ? ঋক বুঝতে পারলো ক্রমশঃ তার ভেতরের খুনী সত্ত্বাটা চিড়বিড় চিড়বিড় আওয়াজ করছে। যে আওয়াজ শোনা যায় অনেক উঁচু হাইটেনশান লাইনের নিচে। এক ধরণের মৃত্যুসংগীত লেখা হয়ে থাকে ওই ধরণের সুরে।
সিঁড়ি বেয়ে আস্তে আস্তে উপরে উঠলো ঋক। এই পথটুকু যেন মনে হচ্ছিলো হাজার হাজার মাইল। সাহেবকে দেখতে পেলো সে। সাহেব গলায় বাইনোকুলার ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আর একটি অভূতপূর্ব সূর্যোদয়ে ছেয়ে যাচ্ছে পাহাড়গুলি। এক মুহূর্ত ভাবলো ঋক কুকরিটা হাতে নেবার আগে। মনে পড়ে গেলো সেই সাধুর মুখ। সাহেব কিছু বুঝতে পারার আগেই ঋক কুকরিটা ঢুকিয়ে দিল একটা না-ফাঁপা না-ভরাট মেরুদণ্ডের পাশে। অবশ্য তক্ষুনি একটা সমান্তরাল মৃত্যু অনুভব করলো সে। তার পিঠের কাছটায় একটা ছুরি শরীরটাকে এস্পার ওস্পার করে বেরিয়ে গেছে। কৌশল্যা দাঁড়িয়ে ছুরি হাতে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পড়তে ঋক বুঝতে পারলো, সাহেবকে খুন করার সময় সে ছিল এক অর্ধ-মানুষ। গত রাত্রেই তার অর্ধ-মৃত্যু ঘটেছে দশ নম্বর এন-১০ ট্যাবলেটটা খাওয়ার পর, ঘুমের মাঝে। সে অর্ধ-মৃত্যুর গন্ধ পৌঁছেছে জন্মসূত্রে অন্তর্যাতায়াত ক্ষমতাপ্রাপ্ত কৌশল্যার কাছে। তাই কৌশল্যাকে তার বরাদ্দ খুনটা করতে হয়েছে। প্রশ্নটা হলো সাহেবকে হত্যা করার ভার কেন কৌশল্যা নিলোনা ?
একটি ব্লুজ গান মনে পড়লো ঋকের। স্প্যানিশ গান। যার তর্জমা করলে এমনটা দাঁড়ায়, "ভালোবাসার মানুষকে মারার কর্তব্য আমায় দিওনা। আমি আত্মহত্যায় সুখী হবো।" চোখ ফিরিয়ে দেখলো ঋক, সূর্যের শেষ ফালিটুকু পাহাড়ের আড়াল থেকে উঠতে উঠতে কিভাবে কৌশল্যার দেহখানি ওয়াচটাওয়ারের ওপর থেকে মাটি স্পর্শ করলো।

No comments:
Post a Comment