অস্তনির্জন দত্ত

টাইটেল


সৌনক চোখ সরাল আবার, হালকা হাওয়ায় উঠল, দেখল ছোটো ঘুমের বার্বি গুলো আর মায়া বেড় দিয়ে চলে যাওয়া একটা ঝিম হাইওয়ে। হ্যাংওভার। বোকাচদা আবার হ্যাংওভার।

ওর মনে পড়ল অনেক রাতে আরও একবার উঠেছিল সে। পেট থেকে পাকিয়ে ওঠা কিছু ওকে খাড়া করে দিয়েছিল। বেসিনটা কি শান্ত ছিল, ওগো রাতের বেসিন। আর বমি নামাতে নামাতে ক্রমাগত মনে হচ্ছিল ও একটা ইনসেস্ট সেক্স এর মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে ক্রমশ। শাদা আর অর্থহীন আর চটচটে আর ভীষণ টক।

এই নিয়ে পাঁচবার গত পনেরদিনে। সৌনক চোখ খুলে আস্তে তাকাল, পায়ের পাঁচটা আঙুল রিবাউন্ড করল। এক-তারপর আর এক। কাল বা তার আগেরদিন বা তারও আগেরদিন বৃষ্টি হয় নি। জানালার নিচে শুকনো পাতা, মাথার ভেতর পাতা- শুকনো।

ঘরটা ছোট ও মেয়েলি। তিলমারা খানিকটা মিশিয়ে ও তুলতুলে। মাঝে মাঝে কেয়োকার্পিণের গন্ধ পাওয়া যায়। হেয়ারক্লিপের ছায়া, ওর দিদি ঠিক এক মাস আগে বিয়ে করে ওকে এই সুস্মেলি মেটাফরগুলি গিফট করে গেছে।
এই ঘর তৎসহ একটি ফ্যান একটা ড্রেসিংটেবিল আর ছিমছাম এক র‍্যাক যা আগে যাবতীয় ময়েশ্চরাইজারে চুপচুপে হয়ে থাকত, আপাতত কিছু কবিতার বই, কি রিপ্লেসমেন্ট ভাবা যায় না! সৌনকের মাঝে মাঝে মনে হয় শালা বই গুলোও পেডিকিওর, মেনিকিওর করে বসে আছে এখন।

‘ফাক’ গলায় একটা ভয়েড তুলে ও উঠে বসল। সকাল সাড়ে আটটা ও সাড়ে আটটার হ্যাংওভার।

পাঁচবার গত পনেরো দিনে।

ব্রাশে দাঁত দিয়ে ও চোখ কুঁচকে ফেনাগুলো দেখছিল আর ভাবছিল-why? বাঁড়া problem টা কি! একেবারে যে আগে হয় নি, তা নয়। বাট এত ঘন ঘন। সৌনক চোখে মুখে জল দিল আর দেখল কেয়োকার্পিণের হালকা গন্ধটা আবার সারা ঘর জুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে...স্ট্রেঞ্জ।  
মা... আয়নার সামনে দাঁত বার করে এই করতে করতে ও চেঁচালো- একটু লেবু চা করে দেবে! আর শুনতে পেল ফোনটা রবীন্দ্রসংগীত গাইছে।
-   হ্যালো! হ্যাঁ দিদি বল, মাকে দেবো! অ্যাঁ কি বলছিস অ্যাকার্ড , ও আই কার্ড ফেলে গেছিস- কোথায়? ড্রয়ারে, দাঁড়া দেখছি, দাঁড়া দাঁড়া ড্রেসিংটেবিলের নিচের ড্রয়ারটার কথা বলছিস তো! ওকে ওকে-

আরে শালা আই কার্ড কি! এত সঙ্গে গুচ্ছের চুড়ি, নার্ডার লিপ্সটিক মাইরি! একটা কেয়ার ফ্রিও। যাতা।

ফোনটা রাখতে রাখতে সৌনক দেখল পাঁচটা মিসকল গত রাতের। ও মাই গড- তিতলি- পাঁচবার একটা মেসেজ ? কোয়েশ্চন মার্ক। খাইসে, খুব দ্রুত ও তিতলিকে ডায়াল করল, এখন ফোন ধরলে হয়!

তিতলি ডায়াল করতে করতে সৌনক বুঝতে পারল ওর কব্জিটা আস্তে আস্তে হাঁটাচলা করছে- আর আবার সেই কেয়োকার্পিণের গন্ধটা আয়নার থেকে বেরিয়ে এসে ওর মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে ক্রমশ- ও ভুলে যাচ্ছে, ভুলে যাচ্ছে- তিতলির টাইটেলটা কি যেন-

-   হ্যালো তিতলি
-   হু
-   হ্যালো তিতলি
-   হু- বলো
-   হ্যালো তিতলি
-   আরে হ্যাঁ- হ্যাঁ বলো, কি হলো – কি হয়েছেটা কি! তখন থেকে কি তিতলি তিতলি করে চেঁচাচ্ছো!
-   তিতলি তোর কি যেন টাইটেল আছে !
-   মানে!
ওপাশ থেকে খট করে ফোন রাখার আওয়াজ হল। তারপর আরো কিছু পর পর ডায়াল ও সুইচড অফ।
দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে ও স্টেপগুলোকে লম্বা করে নিচে নামতে লাগল

“ তিতলি তুই বুঝলি না, তুই কি জানিস তোর কিন্তু কোনো টাইটেল থাকা উচিৎ নয়, মানে মানে ধর, একদম ভাব- তুই উড়ছিস। তোকে সবুজ সালোয়ারে দারুণ স্যুট করে যাচ্ছে, আর বৃষ্টির মধ্যে তুই কত হালকা, ছটফটে, কন্টুর। এবার তিতলির পাশে বোস বসা, হালদার বসা,  চ্যাটার্জি , মুখার্জি, ঝুনঝুনওয়ালা, তিতলি মহালনবিশ, তিতলি কর্মকার, তিতলি পাত্র, ধুস দ্যাখ দ্যাখ ঐ ওড়াটা কেমন পড়ে যাচ্ছে, তুই আর হালকা থাকছিস না- ক্রমশ ভারি হয়ে পড়ে যাচ্ছে সব তিতলি...”
কোথায় যাচ্ছিস, বুনু লেবু চা বলেছিলস্‌    
আর চাই না, মাকে হাঁক দিয়ে লাফিয়ে বড় রাস্তায় নেমে গেল সৌনক। আর নাক উঁচু করে দেখল সেই কেয়োকার্পিণের হালকা গন্ধটা তাকে এতটা পর্যন্ত ছেড়ে দিতে এসেছে।
বাসু দা এককাপ কড়া করে চা দাও, মাথা ধরে পুরো হলদিরাম হয়ে আছে, বাপস্‌, এক প্যাকেট সিল্ককাট মারো। আদা আছে আদা, মাইরি একটু চায়ে... আর পার্থ আসে নি-এখনও, যা শালা।
হ্যালো পার্থ, কোথায়? কোথায়-এয়ারপোর্ট এ যা শালা এত সকালে, ও ড্রপ করতে গেছিস, হয়ে গেছে, আসবি? কতক্ষণ , আধঘন্টা, ঠিক হ্যায় আমি বাসুদার দোকানে, হ্যাঁ হ্যাঁ সিওর বসে আছি। চলে আয়।
ফোনটা নামিয়ে সৌনক দেখল সামনে একটা বাস আর ও উঠে পড়ল।

উরি শালা, গুছিয়ে ভিড় তো! কলকাতায় মানুষগুলো কি লগারিদম শিখে সেক্স করে নাকি। কে জানে।সৌনক মন দিয়ে মানুষের বসে ও দাঁড়িয়ে থাকা দ্যাখে। গাল চুলকে বুঝতে পারে দাড়িটা আজ কামালে ভালো হত।

আর ওর অদ্ভুতভাবে মনে হয়, প্রত্যেক মানুষ ও তার টাইটেল এর মধ্যে যে স্পেস তা মূলত একটা হালকা স্প্রিং এর কাজ করে ও মানুষকে সুস্থ ভাবে বসিয়ে রেখে দেয়। বাসটা এইখানে ব্রেক কষে আর আচমকা ঝাঁকুনি খেয়ে সৌনক পরিস্কার দেখতে পায় অসংখ্য মানুষ বসে আছে আর তার কোমরের দিক থেকে সেই স্প্রিংটা পেঁচিয়ে সিটের তলায় চলে গেছে- হালদার, চক্রবর্তী, মল্লিক, দাশগুপ্ত, সৌনকের নাকে কেয়োকার্পিণের গন্ধটা ঝাপট মারে।
সৌনক ভয় পায়। সৌনক বাস থেকে নেমে পড়ে। সৌনক সিগারেট ধরায়।
ওর হাত কাঁপে। আস্তে আস্তে কব্জিটা চলতে শুরু করে দেয়। ওর আরও ভয় পায়। চারিদিক তাকায় ও। দোকান পাট মানুষ ঠেলাওলা সমস্ত কাঁপতে থাকে ওর রেটিনায়। আর সব মুছে গিয়ে ক্রমশ ভেসে ওঠে একটা নীল দরজা ও দরজার ওপাশ একপাশ হালকা কেয়োকার্পিণের গন্ধ।

হাতের সিগারেটটা সজোরে পিচরাস্তায় ফেলে ও ডেকে ওঠে ট্যাক্সি।

ট্যাক্সি থেকে নেমে হুড়মুড় করে সিঁড়ি ভেঙে ও দোতলায় পৌছায়। হাঁপাতে থাকে। বন্ধ দরজার সামনে সৌনকের মনে হয় সে আর পারবে না, কিছুতেই পারবে না। ওর ঘাম হতে থাকে, গলা শুকিয়ে যায়। একটা গাঢ় কেয়োকার্পিণের গন্ধ ওকে অবশ করে দিতে থাকে। দরজার ওপাশে কিছু- সৌনক হাতড়ে হাতড়ে ফোন বার করে তিতলিকে ডায়াল করে-

তিতলি হ্যালো হাঁ তিতলি হাঁ তিতলি আমাকে বিয়ে করবি, এক্ষুনি , প্লিজ, হ্যাঁ এক্ষুনি তিতলি- প্লিজ। 

No comments:

Post a Comment

বাইশ গজের খাতা

Powered by Blogger.

Total Pageviews

যোগাযোগ করুন

Name

Email *

Message *

লেখা পাঠাবার ঠিকানা

আপনাদের ছোটো বা বড় গল্প পাঠান । বিশেষ করে সেই লেখাটি যা কেউ পড়বেনা ভেবে পাঠাননি আগে কোথাও। লেখা পাঠাবার ঠিকানা-mackerelblogzine@gmail.com

*[ লেখা বেছে নেবার ক্ষেত্রে সম্পাদকের রায় চুড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে । ]

Copyright © ম্যাকারেল | Powered by Blogger
Design by SimpleWpThemes | Blogger Theme by NewBloggerThemes.com | Distributed By Blogger Templates20