জবানবন্দী
![]() |
শিল্পী:অর্পণ ঘোষ
|
অতঃপর পরকীয়া। আচ্ছা, একে কি পরকীয়া
বলা চলে? আমি কি সত্যি প্রেমে পড়েছিলাম? কোনো পুতুলের সঙ্গে কি প্রেম করা যায়? কোনো
পুতুলের প্রেমে পড়া যায়? অবশ্য আমার বিবাহিত স্ত্রীও এক পুতুলই। পক্ষাঘাতগ্রস্ত।
কোমরের নীচ থেকে অসাড়। হাত ও মুখ নাড়তে পারে। কিন্তু তাও খুব ধীরে ধীরে। খুব জোরে গাড়ি ছুটছিল। ফেটাল অ্যাকসিডেন্ট। বিয়ের ছ মাস পরে। শ্রাবণী মারা যায়নি, কিন্তু ওর শরীর
মৃত্যুবরণ করে। আমি বেঁচে যাই। সামন্য আঁচড়ের বেশী কিছুই হয়নি আমার। শেষ মুহূর্তে
ডান দিকে কাটিয়ে ছিলাম গাড়িটা। উল্টো দিকের গাড়িটা সামনে থেকে সোজা ধাক্কা মেরেছিল
গাড়ির বাঁ দিকে। দুমড়ে গেছিল গাড়ির বাঁ দিকটা। গুঁড়িয়ে
গেছিল বলা চলে। আমার বাঁ দিকে বসে থাকা শ্রাবণী মারাত্মক চোট পায়। ক্রমশ বিকল হয়ে
যায় বেশিরভাগ স্নায়ু। কোমর ভেঙে যায়। আর জোড়া লাগেনি। কোমর থেকে পা আর চলে না। যদিও
মুখ চলে সবসময়। ভীষণ মুখরা শ্রাবণী। রাগ বেড়েছে, রোগের সঙ্গে সঙ্গে। যন্ত্রণার সঙ্গে সঙ্গে ঘৃণাও
বেড়েছে। তার সঙ্গে সন্দেহ। ওর মনে হয় ওর অ্যাকসিডেন্টের জন্য আমিই দায়ী। ইচ্ছাকৃত অ্যাকসিডেন্ট। আমিই কি করেছিলাম অ্যাকসিডেন্ট? ইচ্ছা করে? আমার তো গাড়িটা বাঁ দিকেই কাটানো
উচিৎ ছিল। সাধারণত সেটাই তো নিয়ম। তাই না? আমি কি ইচ্ছা করে ডান দিকে কাটিয়ে ছিলাম
গাড়িটা? যাতে শ্রাবণী চোট পায়? দুমড়ে-মুচড়ে যায়? মরে যায়? কিন্তু কেন? টাকা?
সম্পত্তি? নমিনি? শেয়ার? বাড়ি? গাড়ি? শ্রাবণী অবশ্য বলে পরকীয়া করব বলে। কিন্তু বিগত
আট বছর ধরে আমি কোনো পরকীয়া করিনি। আমি পরকীয়া করতে চাই না। আমি ব্যভিচারকে ঘৃণা
করি। যদিও আমার ব্যভিচারী হওয়ার অনেক সুযোগ ছিল। কারণ ছিল আরও বেশী। বিগত আট বছর আমি ক্ষুধার্ত। চরম ক্ষুধার্ত। শ্রাবণীর সঙ্গে
কোনো সেক্স হয়নি। ওর সঙ্গে সেক্স করা সম্ভব নয়। এভাবে বেঁচে থাকা যায়? এভাবে, চরম খিদে
নিয়ে? আট বছর? আমি ছিলাম। অসম্ভব ধৈর্য এবং সংযমের সঙ্গে। কারণ আমি পরকীয়া প্রেমকে
ঘৃণা করি।
হ্যাঁ, আমি অনেক প্রেম করেছি। শ্রাবণীর সঙ্গে প্রেম
করার আগে আরও প্রেম করেছি। অনেক প্রেম। শেষে শ্রাবণী। শ্রাবণী অবশ্য বলে আমি
বাকিদের ডিচ করেছি ওর জন্য। ওর পয়সার জন্য। ওর সম্পত্তি দেখে ওকে বিয়ে করেছি। আমি
দেখতে হ্যান্ডসাম, কিন্তু রোজগার প্রায় ছিলই না। এখনো নেই সেইভাবে। শ্রাবণী এখন
বলে এসব কথা। আগে বলত না। বিয়ের আগে, বিয়ের পরে পরে, বলত না। কিন্তু আমি কখনো
ব্যভিচার করিনি। একসঙ্গে আমি একাধিক মেয়ের সঙ্গে কখনো প্রেম করিনি। একটার পর একটা
সম্পর্ক ভেঙেছে, আবার নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আমি শ্রাবণীকে ভালবেসেছিলাম। ওর
সমস্ত কিছু নিয়েই ওকে ভালবেসেছিলাম। ওর সমস্ত কিছুর জন্যই ওকে ভালবেসেছিলাম। আমি
নিজে হাতে ওর সেবা করেছি। আট বছর। খুব ধৈর্যের সঙ্গে, আট বছর। সবাই দেখেছে। আমিই দেখিয়েছি সবাইকে। সবাই বলত একটা কাজের মেয়ে রাখো। শ্রাবণীর
দেখাশোনার জন্য। সারাক্ষণ দেখাশোনার জন্য। আমি রাখিনি। আমি রাখিনি কারণ পাছে
শ্রাবণীর যত্নের অভাব হয়। পাছে আমি...। আমি চাইনি একই ছাতের
নীচে অন্য একটি মেয়ে থাকতে শুরু করুক। আমি শ্রাবণীর সঙ্গেই থাকতে চেয়েছিলাম। শুধু
শ্রাবণীর সঙ্গে। যদিও আমাদের সেক্স হত না। হত না কোনো প্রেমের কথাও। সবাই তা জানত। না জানলেও, বুঝত। আমি চেয়েছিলাম সবাই
বুঝুক। সবাই বুঝুক আমি কতটা ভালবাসি শ্রাবণীকে। শুধু শ্রাবণীকে। বুঝুক আমি কতটা সৎ।
কতটা নিষ্ঠাবান। বুঝুক আমি ব্যভিচারকে প্রশ্রয় দিই না নিজের মনে। আমি পরকীয়াকে
ঘৃণা করি। ইনফিডালিটিকে ঘৃণা করি। সবাই বুঝেছিল। বোঝেনি শুধু শ্রাবণী। শ্রাবণী
আমায় সন্দেহ করত। ঘৃণা করতে শুরু করে ক্রমশ। শ্রাবণী ধনুকভাঙা পণ করল আমার হাতে খাবে না। সবাইকে জানাল আমি ওর যত্ন করি না।
আমি ওকে দেখাশোনা করি না। আমি ওকে ঠকাই। সবাই জানল। কিন্তু মানল কি? বিশ্বাস করল? সবাই
ওকে বোঝাল। আমাকেও বোঝাল। শ্রাবণী সত্যি আরও
শুকিয়ে যাচ্ছিল। ও ফুরিয়ে আসছিল। হয়তো আমারই দোষ। হয়তো আমি ঠিক ভাবে যত্ন নিতে
পারছিলাম না। হয়তো আমিই...। শেষে এল পুতুল। কাজের মেয়ে। শ্রাবণীর সর্বক্ষণের
দেখাশোনা করার মেয়ে।
পুতুল সত্যি পুতুলই ছিল। আয়নার সামনে নয়, টাকার
সামনে। টাকা দিলে পুতুলের মতো চুপচাপ কাজ করে যেত। যা বলতাম তাই করত। নির্জীবের
মতো। আমি ওকে নগ্ন হতে বলতাম। ও হত। আমি ওকে সেই অবস্থায় ঘুরতে বলতাম। ও ঘুরত। সেই
অবস্থায় কাজ করতে বলতাম। করত। আমি দেখতাম। দূর থেকে। শুধু দেখতাম। কিন্তু কখনো ছুঁতাম না। একবারও ছুঁইনি। আহ! আমার
ক্ষুধার্ত শরীর বশে থাকত না। ওর শরীর ছুঁতে চাইত আমার শরীর। ছুঁয়ে দেখতে চাইত। আরও
ঝুঁকে পড়ছিলাম আমি পুতুলের দিকে। ক্রমশ, ধীরে ধীরে। অতঃপর পরকীয়া। আচ্ছা, একে কি পরকীয়া বলা চলে? আমি কি সত্যি প্রেমে
পড়েছিলাম? কোনো পুতুলের সঙ্গে কি প্রেম করা যায়? কোনো পুতুলের প্রেমে পড়া যায়? এ
কি শুধুই যৌন ক্ষুধা ছিল না? আমার অতৃপ্ত শরীরের ডাক? পুতুলের ক্ষেত্রে যা ছিল
টাকার লোভ। সে নির্জীব ভাবে আমার ডাকে সাড়া দিত। কলের পুতুলের মতো কাজ করে যেত
শুধু। আর কিছুই হত না। আর কিছুই ছিল না। অবশ্য তাতে কিই বা এসে যায়? খিদে মিটলেই
হল। তাই না? কিন্তু আমি পরকীয়াকে ঘৃণা করতাম। ব্যভিচারকে ঘৃণা করতাম। আমি কি তখনো
শ্রাবণীকে ভালবাসতাম? আমি তো জানতাম ওর সবকিছু ফুরিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। আর কিছু
দেওয়ার মতো অবস্থায় ও নেই। আর কিছু দিতে ও পারবে
না। তারপরেও আমি ভালবাসতাম? আমি কখনো একসাথে দুজনের সঙ্গে প্রেম করিনি। কখনো না। আমি
ঘৃণা করি ব্যভিচার। কিন্তু শ্রাবণী আমায় সন্দেহ করত। পুতুলের সঙ্গে আমি ব্যভিচার
করছি বলে সন্দেহ করত। দিন দিন ওর সন্দেহ বাড়তে থাকে। আমারও খিদে বাড়তে থাকে। যখনি
আমি পুতুলকে নগ্ন হতে বলতাম, নগ্ন অবস্থায় দেখতাম, আমার তলপেটের নীচে মোচড় দিত
ভীষণ। দিন দিন বাড়তে থাকে সেই মোচড়। দিন দিন বাড়তে থাকে লালসা। আমার ওকে চাই। ওর
শরীর চাই। পুরোটা চাই। পুরো। আমার আট বছরের অতৃপ্ত খিদে মেটানো চাই। শ্রাবণী বুঝতে
পারে আমার অবস্থা। শ্রাবণী পড়তে পারে আমার মন। একমাত্র ওই আমায় সঠিক ভাবে জানত, ভালো
ভাবে বুঝত। আমি জানতাম শ্রাবণী বোঝে। আমি চাইতাম শ্রাবণী
বুঝুক। ও বুঝেছিল। শ্রাবণী থাকতে আমি অন্য কারুর সঙ্গে সেক্স করতে পারব না।
শ্রাবণী মেনে নেবে না এই কাজ। শ্রাবণী জানিয়ে দেয়।
জানিয়ে দেয় আমায়। আমিও কিন্তু চাইছিলাম না তা করতে। কিছুতেই চাইছিলাম না। আমিও তো
কিছুতেই ব্যভিচার করতে চাই না। আমিও তো বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাই না। আমি ঘৃণা করি
এই অন্যায়, এই পাপ। শ্রাবণী থাকতে আমি অন্য কারুর সঙ্গে কেন সেক্স করব? আমার
অতৃপ্ত খিদে কেন মেটাব না শ্রাবণীর সঙ্গেই? হ্যাঁ, শ্রাবণীর সঙ্গেই হবে সেক্স। শ্রাবণীর সঙ্গেই। অন্য কারুর সঙ্গে নয়। আমি জানি ও সইতে পারবে না। আমি জানি ও এই ধকল সইতে পারবে
না। কিছুতেই পারবে না। আমি জানি ও...। কিন্তু আমি পরকীয়াকে ঘৃণা করি। ব্যভিচারকে ঘৃণা করি।
আমি একজন থাকতে আর একজনের সঙ্গে প্রেম করিনি। সঙ্গমও করব না। শ্রাবণী থাকতে
পুতুলের সঙ্গে সেক্স করব না। কিছুতেই করব না। এ অন্যায়। এ পাপ। আমি কি কোনো অন্যায়
করতে পারি? আমি কেন অন্যায় করব? কেন অপরাধ করব? আহ! আজ আট বছর পরে! আহ! আমি আর
শ্রাবণী! আহ! আমি আর আমার বিবাহিত স্ত্রী! আহ! আট বছর বাদে। আহ! আমি কি কোনো অপরাধ
করছি? আমিই কি দায়ী? শ্রাবণীর মৃত্যুর জন্য? আমিই কি অপরাধী? সমস্তকিছুর জন্য?

No comments:
Post a Comment